চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিতে বেইজিংয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফেরানো এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা কমাতে ওয়াশিংটনের কয়েক সপ্তাহের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির নেতারা বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বৈঠকে বসবেন। ২০১৭ সালের পর এটি চীনে ট্রাম্পের প্রথম সফর। বৈঠকে বাণিজ্য, তাইওয়ান, এআই এবং ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠক?
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান এবং ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রায় এক দশকের মধ্যে ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন নেতা হিসেবে চীন সফর করছেন। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে বৈঠকটি হওয়ার কথা থাকলেও ইরান যুদ্ধের কারণে তা পিছিয়ে যায়।
বেইজিং সফরের আগে ট্রাম্প জানান, তিনি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ইরান ইস্যুতে ‘দীর্ঘ আলোচনা’ করবেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাণিজ্যই সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সালভাদর সানতিনো রেগিলমের মতে, বাণিজ্য ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভোটারদের কাছে তা সহজে ব্যাখ্যা করা যায়। তবে প্রকৃত দ্বন্দ্ব বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থাকে ঘিরে।
বৈঠকে যেসব ইস্যুতে উত্তাপ
প্রযুক্তি ও বিরল খনিজ
ওয়াশিংটন চীনের কাছে উন্নত সেমিকন্ডাকটর ও চিপ তৈরির প্রযুক্তি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, চীনের সামরিক ও এআই সক্ষমতা ধীর করতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক বিরল খনিজ পরিশোধনের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চীন। সেমিকন্ডাকটর, বৈদ্যুতিক যান, সামরিক সরঞ্জাম ও ইলেকট্রনিক পণ্যে এসব খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র চায় চীন আবার বিরল খনিজ রপ্তানি শুরু করুক, কারণ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে মার্কিন অটোমোবাইল ও এয়ারোস্পেস খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি
ইরান যুদ্ধ এই বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন চাইবে বেইজিং তেহরানের ওপর প্রভাব খাটাক। কারণ, চীনই ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা—তারা ইরানের রপ্তানিকৃত অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে।
স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ড্যান গ্র্যাজিয়ারের মতে, ট্রাম্প অবশ্যই চেষ্টা করবেন যেন শি জিনপিং ইরানকে আলোচনায় ফিরতে চাপ দেয়।
এদিকে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গ্রেগরি পোলিং বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের স্বার্থে হওয়া।
তাইওয়ান ইস্যু
তাইওয়ান ইস্যু বৈঠকের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হতে পারে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্বীপটির চারপাশে সামরিক চাপও বাড়িয়েছে।
বর্তমান তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই চিং-তেকে নিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে মূল ভূখণ্ড চীনকে স্বীকৃতি দিলেও তাইওয়ানের আত্মরক্ষায় সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।
শুল্ক যুদ্ধ
বাণিজ্যও বড় একটি অচলাবস্থার কারণ হয়ে উঠতে পারে। গত বছর ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করলে চীনও পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। একপর্যায়ে কিছু পণ্যে শুল্কের হার ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় উদ্বেগ তৈরি করে।
পরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় উভয় দেশ সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমাতে সম্মত হয়। চীন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও বেশি সয়াবিনসহ কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং ওয়াশিংটনও কিছু শুল্ক প্রত্যাহার করে।
কী হলে সফল হবে এই বৈঠক?
ট্রাম্পের জন্য সফলতা হবে এমন কোনো দৃশ্যমান চুক্তি, যা তিনি দেশের জনগণের কাছে রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন। এর মধ্যে থাকতে পারে—চীনের পক্ষ থেকে মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি, শুল্ক হ্রাস, ইরান ইস্যুতে সহযোগিতা কিংবা বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ে অগ্রগতি।
অন্যদিকে, শি জিনপিংয়ের জন্য সফলতা হবে ওয়াশিংটনের কাছে নতি স্বীকার না করেই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিশ্বশক্তি হিসেবে চীনের অবস্থান আরও সুসংহত করা।
মনে করা হচ্ছে, পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা কম। তবে সীমিত পরিসরে শুল্ক স্থগিত, পণ্য ক্রয় এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো নিয়ে সমঝোতা হতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা