আফ্রিকা ও ইউরোপের সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজানোর লক্ষ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার ছোট রাজতান্ত্রিক দেশ এসওয়াতিনিতে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলন। প্রথমবারের মতো আফ্রিকা-ইইউ পার্লামেন্টারি অ্যাসেম্বলির পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন বসেছে ইউরোপের বাইরে, আফ্রিকার মাটিতে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু স্থান নির্বাচনই নয়, এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে বদলে যাচ্ছে আফ্রিকা ও ইউরোপের কূটনৈতিক সম্পর্কের ভাষা ও বাস্তবতা।
প্রসঙ্গত, এসওয়াতিনির পূর্ব নাম ছিল সোয়াজিল্যান্ড। বর্তমানে এটি এসওয়াতিনি নামে পরিচিত। দক্ষিণ আফ্রিকার একটি ছোট, স্থলবেষ্টিত রাজতান্ত্রিক দেশ, যা মোজাম্বিক ও দক্ষিণ আফ্রিকার সীমান্তে অবস্থিত। এটি আফ্রিকার সর্বশেষ নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রগুলোর একটি। রাজধানী এমবাবানে এবং লবম্বা। বৈঠক আয়োজকরা চমক হিসেবে অখ্যাত এই দেশকে বেছে নিয়েছেন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে।
১২ থেকে ১৪ মে পর্যন্ত চলা এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন আফ্রিকার ৭৯টি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের সংসদ সদস্য ও প্রতিনিধিরা। সব মিলিয়ে ১০৬টি দেশের প্রতিনিধিদের এই প্ল্যাটফর্মকে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তঃআঞ্চলিক পার্লামেন্টারি জোট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্মেলনের উদ্বোধন করেছেন এসওয়াতিনির প্রধানমন্ত্রী রাসেল মিসো ডলামিনি। এতে সহ-সভাপতিত্ব করছেন বেলজিয়ামের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য হিল্ডে ভাউটমানস এবং বেনিনের সংসদ সদস্য ডেভিড হাউইনসা। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে এসওয়াতিনির বিখ্যাত এজুলউইনি পালাজো কনভেনশন সেন্টারে।
এই সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে রয়েছে পাঁচটি বড় বিষয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বহুপাক্ষিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ, যুবাদের চলাচল ও কর্মসংস্থান, কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে কৌশলগত খনিজ সম্পদ নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বিষয়টি।
বিশ্লেষকদের মতে, আফ্রিকার লিথিয়াম, কোবাল্ট, ম্যাঙ্গানিজ, কোলটান ও বিরল খনিজ নিয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনের মধ্যে নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি শিল্পের জন্য এসব খনিজ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইউরোপ আফ্রিকার সঙ্গে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপ আগে আফ্রিকাকে মূলত সাহায্যনির্ভর অংশীদার হিসেবে দেখত। কিন্তু এখন সেই সমীকরণ বদলাচ্ছে। কারণ ইউরোপের শিল্প ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আফ্রিকার সম্পদ এবং তরুণ জনগোষ্ঠী ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আফ্রিকার ওপর ইউরোপের নির্ভরতা দিনকে দিন বাড়ছে।
এই পার্লামেন্টারি অ্যাসেম্বলি মূলত ২০২৩ সালে স্বাক্ষরিত সামোয়া চুক্তির অংশ হিসেবে গঠিত হয়। এটি পুরোনো কোটোনু চুক্তির জায়গা নেয়। নতুন চুক্তির লক্ষ্য হলো, আফ্রিকা ও ইউরোপের সম্পর্ককে দাতা-গ্রহীতা কাঠামো থেকে বের করে সমান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দাঁড় করানো।
আলোচনায় যুদ্ধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে সুদান, পূর্ব কঙ্গো, সাহেল অঞ্চল ও সোমালিয়ায় চলমান অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে ইউরোপের। কারণ এসব সংঘাতের প্রভাব সরাসরি পড়ছে অভিবাসন, মানবপাচার ও সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকিতে। ফরাসি সেনাদের সাহেল অঞ্চল থেকে সরে যাওয়ার পর ইউরোপ এখন আফ্রিকান আঞ্চলিক জোটগুলোর ভূমিকা নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে।
এছাড়া তরুণদের চলাচল ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আফ্রিকার বিপুল যুব জনগোষ্ঠীকে ইউরোপ এখন শুধু অভিবাসনের চাপ হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তি ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবেও দেখতে শুরু করেছে। তাই অভিবাসন শব্দের বদলে যুব চলাচল শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এসওয়াতিনির মতো ছোট একটি দেশকে এই সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে বেছে নেওয়াও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সাধারণত আফ্রিকার বড় অর্থনীতি বা শক্তিশালী দেশগুলোই এমন আয়োজনের কেন্দ্র হয়। কিন্তু এবার ছোট রাজতান্ত্রিক দেশ এসওয়াতিনিকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে আফ্রিকার কূটনৈতিক মানচিত্রকে আরও বিস্তৃত করার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্মেলনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আফ্রিকা কি এবার সত্যিই নিজের কৌশলগত গুরুত্বকে কাজে লাগাতে পারবে? নাকি আগের মতোই বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মাঠ হয়ে থাকবে? কারণ আফ্রিকার সম্পদ এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
সম্মেলন শেষে গৃহীত সুপারিশ আফ্রিকা-ইউরোপ কাউন্সিল অব মিনিস্টার্সের কাছে পাঠানো হবে। তবে বাস্তবে এসব সুপারিশ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: মডার্ন ডিপ্লোম্যাসি ও রয়টার্স