শশী থারুরের মতামত
কেরালার রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে দীর্ঘকাল ধরে একটি পেন্ডুলামের সঙ্গে তুলনা করা হয়, যা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর লেফট ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) ও ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের (ইউডিএফ) মধ্যে দুলতে থাকে।
২০২১ সালে এই ছন্দে ছেদ পড়েছিল। তখন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি-মার্ক্সবাদীকে (সিপিআই-এম) ঘিরে এমন এক ধরনের অজেয় আবহ তৈরি হয়, যা অনেককেই বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিল, ‘ক্ষমতার ধারাবাহিকতাই’ হয়তো কেরালার নতুন নিয়মে পরিণত হতে যাচ্ছে।
কিন্তু ২০২৬ সালে পেন্ডুলামটি কেবল আগের অবস্থানেই ফিরে যায়নি; বরং এটি ঘড়িটিকেই চুরমার করে দিয়েছে।
ইউডিএফের এই নির্ণায়ক বিজয়, যেখানে তারা ১০২টি আসন পেয়েছে আর এলডিএফ পেয়েছে মাত্র ৩৫টি, এটি কেবল ক্ষমতার সাধারণ রদবদল নয়। এটি মূলত বিশেষ শাসনশৈলীর প্রতি কাঠামোগত প্রত্যাখ্যান এবং আদর্শগত শূন্যতার বহিঃপ্রকাশ, যা ভারতের শেষ ঘাঁটিতেও বামপন্থীদের বিধ্বস্ত করে দিয়েছে।
এলডিএফের এই পরাজয়ের মূলে রয়েছে দম্ভ, যা কেরালার মানুষের মনস্তত্ত্বকে ভুলভাবে বোঝার সঙ্গে জড়িত।
২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচার ছিল রাজ্যের ইতিহাসে নজিরবিহীন। পুরো রাজ্যজুড়ে মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের বিশাল সব প্রতিকৃতির মাধ্যমে ক্ষমতার এক অভূতপূর্ব কেন্দ্রীকরণ দেখা গিয়েছিল।
তাদের নির্বাচনী প্রচারের স্লোগান ছিল, ‘মাট্ট আরুন্দে?’ (অর্থাৎ, ‘আর কে আছে?’), যার উদ্দেশ্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিকল্পের অভাবকে ফুটিয়ে তোলা।
কিন্তু বাস্তবে এটি এমন এক ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিল, যা সাধারণ ভোটার তো বটেই, এমনকি দলের অনেক সমর্থকের কাছেও শ্বাসরুদ্ধকর মনে হয়েছে।
একনায়কতন্ত্র প্রত্যাখ্যান
কেরালার গণতন্ত্র সহজাতভাবেই তর্কপ্রবণ, বিকেন্দ্রীভূত এবং বহুত্ববাদী। আর একারণেই এখানে উভয় পক্ষেই বহুদলীয় জোটের মধ্যে লড়াই হয়। একটি ক্যাবিনেটভিত্তিক সরকারকে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল’ স্টাইলের ব্যক্তিপূজায় রূপান্তর করার চেষ্টা করে এলডিএফ তাদের নিজস্ব জনভিত্তি ও নিরপেক্ষ মধ্যবিত্ত—উভয়কেই দূরে ঠেলে দিয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারির অনিশ্চয়তার সময় যে ‘ক্যাপ্টেন’ আখ্যানটি দলের কাজে এসেছিল, গত পাঁচ বছরে তা অস্বচ্ছতা এবং কর্তৃত্ববাদের প্রতীকে পরিণত হয়ে তেতো হয়ে গেছে।
ভোটারদের প্রতিক্রিয়া ছিল স্পষ্ট। গণতন্ত্রে সবসময়ই ‘অন্য কেউ’ থাকে। এই একনায়কতন্ত্রের প্রত্যাখ্যান মূলত কমিউনিস্ট স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে সামষ্টিক গণতান্ত্রিক চেতনার জয়।
বামপন্থীদের এই পরাজয়ের ব্যাপকতা, বিশেষ করে তাদের তথাকথিত ‘দুর্ভেদ্য দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী আসনগুলো হারানো গভীর সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে।
ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন একবিংশ শতাব্দীর ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। পঞ্চাশের দশকে ভূমি সংস্কার এবং শ্রমিক অধিকারের যে মহান লড়াইয়ের প্রতীক ছিল কাস্তে-হাতুড়ি, ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে তা তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ক্রমশই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
আজকের কেরালা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী, বিকাশমান ‘গিগ ইকোনমি’ (এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী চাকরির পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক কাজ বা ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রাধান্য থাকে) এবং এমন এক যুবশক্তির প্রতিনিধিত্ব করে, যারা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার চেয়ে ডিজিটাল উদ্যোক্তা হওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে কাস্তে-হাতুড়ি
এলডিএফ যখন ‘নব্য উদারবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ’ নিয়ে কথা বলেছিল, তরুণ প্রজন্ম সেটিকে দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় বেসরকারি বিনিয়োগের পথে বাধা হিসেবেই দেখেছিল।
এর ফলে শুরু হয়েছে এক ট্র্যাজিক ‘মেধা পাচার’, যেখানে কেরালার মেধাবী তরুণেরা নিজ দেশে সুযোগের অভাবে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কিংবা ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতে পাড়ি জমায়।
বামপন্থীরা হয়তো তাদের ত্রাণ বা রেশনের কিট দিতে পেরেছে, কিন্তু কোনো ভবিষ্যৎ দিতে পারেনি।
বিংশ শতাব্দীর আদর্শের সঙ্গে একবিংশ শতাব্দীর আকাঙ্ক্ষার মেলবন্ধন ঘটাতে ব্যর্থ হয়ে সিপিআই-এম আজ ঐতিহাসিকভাবে একাকী ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
কাস্তে-হাতুড়ি আমাদের ইতিহাসের পাতায় হয়তো অমর হয়ে থাকবে, কিন্তু শ্রমবাজারে তারা তাদের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।
তবে এই গণরায়ের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের কাছে এই রাজ্যের নতি স্বীকার না করার ধারাবাহিকতা।
নির্বাচনী প্রচারে বিভাজনের রাজনীতি ঢুকিয়ে দেওয়ার তীব্র চেষ্টা সত্ত্বেও কেরালার ভোটাররা সুশাসন এবং সামাজিক সম্প্রীতির ওপরই অবিচল থেকেছেন।
এমনকি বিজেপিও এবার হিন্দুত্ববাদের চেয়ে উন্নয়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছে, যা হয়তো তাদের ১৪০ সদস্যের বিধানসভায় তিনটি আসন নিয়ে খাতা খুলতে সাহায্য করেছে।
সত্যিকারের ‘কেরালা স্টোরি’
এই নির্বাচনের ফলাফল থেকে একটি ‘কেরালা স্টোরি' সারা দেশের সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের জেনে রাখা উচিত।
মুসলিমপ্রধান নির্বাচনী এলাকা থাবানুর থেকে নির্বাচিত হয়েছেন খ্রিষ্টার প্রতিনিধি ভি এস জয়। হিন্দুপ্রধান এলাকা কালামাসেরি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন মুসলিম প্রতিনিধি ভি ই আব্দুল গফুর। আর খ্রিষ্টানপ্রধান এলাকা কোচি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন মুসলিম প্রতিনিধি মুহাম্মদ শিয়াস।
মানুষ এখানে প্রার্থীর ধর্ম বা সম্প্রদায়ের বিচার না করে বরং তাদের রাজনৈতিক বার্তা এবং তারা যে আশার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, তার ওপর ভিত্তি করেই ভোট দিয়েছেন।
এই ফলাফল প্রমাণ করে, সত্যিকারের ‘কেরালা স্টোরি' হলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে গড়ে ওঠা এক অসাধারণ পারস্পরিক বিশ্বাসের গল্প।
ভোটাররা যখন আসনের ধর্মীয় সংখ্যাধিক্যের তোয়াক্কা না করে প্রার্থী নির্বাচন করেন, তখন তা ভারতকে ধর্মীয় লাইনে বিভক্ত করতে চাওয়া মানুষদের গালে সজোরে চপেটাঘাত হিসেবে কাজ করে।
ইউডিএফ তাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রার্থী বাছাই এবং সফট-সাম্প্রদায়িকতার পথে না হাঁটার মাধ্যমে এই ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর প্রকৃত রক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় যে, এই ‘কেরালা স্টোরি’র তিন বিজয়ীই ইউডিএফের প্রার্থী।
শশী থারুর ২০০৯ সাল থেকে কেরালার থিরুবনন্তপুরম আসনের কংগ্রেস দলীয় লোকসভার সদস্য, খ্যাতিমান লেখক এবং সাবেক কূটনীতিক।
এনডিটিভি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত