তামিলনাড়ুর রাজনীতির ইতিহাসে ২০২৬ সালটি এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে, যা দীর্ঘ ৪৯ বছরের একটি চক্রকেও পূর্ণ করল। ১৯৭৭ সালে কিংবদন্তি অভিনেতা এম. জি. রামচন্দ্রন (এমজিআর) যেভাবে রূপালি জগতের মোহময়ী আবেদনকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করে রাজ্যের প্রথম অভিনেতা-মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন, ঠিক একইভাবে জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর ওরফে থালাপতি বিজয় ফোর্ট সেন্ট জর্জে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে গেলেন। বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করায় বিজয়ের মালা এখন তার গলায়।
দীর্ঘ দশ বছর ধরে এমজিআর ভক্তদের উন্মাদনাকে জনকল্যাণের এক আবেগীয় রূপে পরিণত করেছিলেন, যার পর অনেক মহাতারকা চেষ্টা করলেও বিজয়ের মতো একক শক্তিতে এমন জাদুকরী উত্থান কেউ দেখাতে পারেননি। জয়ললিতা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দাপট দেখালেও তিনি মূলত এমজিআর-এর প্রতিষ্ঠিত এআইএডিএমকে দলের উত্তরাধিকারী ছিলেন; বিপরীতে বিজয়ের সাফল্য সম্পূর্ণ তার নিজস্ব নবগঠিত দল ‘তামিলাগা ভেট্টি কাঝাগম’ (টিভিকে)-এর হাত ধরে এসেছে। নতুন দল গঠন করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়া ঐতিহাসিক এক ঘটনা।
নির্বাচনী গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিজয়ের মাত্র দুই বছর বয়সী এই নবাগত দলটি ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজনীয় ১১৮টি আসনের লক্ষ্যমাত্রা অনায়াসে পূরণ করে ফেলেছে, যা তামিল রাজনীতির প্রথাগত দ্বিমেরু শাসনকে কার্যত ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
বিজয়ের এই সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং ২০০৯ সাল থেকে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ সংগঠনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে শিক্ষা সহায়তা, ত্রাণ কাজ এবং সামাজিক সমস্যা সমাধানে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার ফসল।
২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) প্রকাশ্য সমালোচনা এবং ২০২৪ সালে চলচ্চিত্র জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিদায় নেওয়ার ঘোষণা সাধারণ মানুষের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছে যে, বিজয় রাজনীতিকে কোনো পার্ট টাইম কাজ হিসেবে দেখছেন না সুপারস্টার। বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং সুশাসনের মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর সোজাসাপ্টা অবস্থান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে।
তামিলনাড়ুর স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজয়ের এই অভাবনীয় সাফল্য দেখে ভারতের অন্যতম প্রাচীন দল কংগ্রেস এখন তাঁর সাথে জোট বাঁধতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। যদিও নির্বাচনের আগে ডিএমকে-র সঙ্গে কংগ্রেসের জোট ছিল, কিন্তু রাজ্য রাজনীতিতে ডিএমকে-র পক্ষ থেকে ক্রমাগত ‘অসম্মান’ এবং সরকারে অংশীদারিত্ব না পাওয়ার ক্ষোভ কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের।
রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বিজয়ের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক এই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। কংগ্রেস নেতা কেসি বেণুগোপাল পরাজয় মেনে নিয়ে স্বীকার করেছেন যে, তামিলনাড়ুর এই ফলাফল তাঁদের জন্য চমকপ্রদ এবং বিজয়কে বাহবা জানিয়ে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে দ্রুতই তামিল রাজনীতি নিয়ে দল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। যদি বিজয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না-ও পান, তবুও ১১০টির মতো আসন তাঁর ঝুলিতে থাকায় তিনি সরকার গঠনের প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এই রিপোর্ট যখন লেখা হচ্ছে, তখনও ভোট গণনা চলছে। যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে তাতে বিজয়ের মালা বিজয়ের গলাতেই উঠবে।
বিজয়ের এই উত্থানকে এমজিআর-এর সঙ্গে তুলনা করা হলেও আধুনিক প্রেক্ষাপটে এর ভিন্ন তাৎপর্য রয়েছে। এমজিআর যেখানে একটি নাটকীয় জনমোহিনী তরঙ্গে চড়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, বিজয়ের শক্তি হলো বর্তমান প্রজন্মের সুশাসনের অভাব এবং একটি স্বচ্ছ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।
২০২৫ সালে কারুরে একটি জনসভায় পদপিষ্ট হওয়ার মতো সংকটকালীন মুহূর্তে তাঁর পরিমিত ও সাংগঠনিক পদক্ষেপ ভোটারদের কাছে তাঁর প্রশাসনিক পরিপক্কতার প্রমাণ দিয়েছে। এখন কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা, তবে এটুকু নিশ্চিত যে থালাপতি বিজয় তামিলনাড়ুর রাজনীতির ব্যাকরণ চিরতরে বদলে দিয়েছেন এবং ডিএমকে-এআইএডিএমকে-এর দীর্ঘ আধিপত্যের বিপরীতে একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।