বিবিসির বিশ্লেষণ
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও পরাজয় স্বীকার করেননি, কিন্তু রাজ্যে যে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি গরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসতে চলেছে সে ইঙ্গিত একেবারে স্পষ্ট।
পনের বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেসের এই নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ কী হতে পারে? এ পর্যন্ত যে ফলাফল পাওয়া গেছে, তা বিশ্লেষণ করে এর পেছনে পাঁচটি মূল কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
১. পশ্চিমবঙ্গের নারী ভোটের (যা ৫০ শতাংশেরও বেশি) বড় অংশই যে এতকাল মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দল পেয়ে এসেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী বা ‘সবুজ সাথী’-এর (ছাত্রীদের মধ্যে সাইকেল বিতরণ) মতো প্রকল্প তৃণমূল সরকারকে নারী ভোটারদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
কিন্তু এবারে সেই ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরেছে, যার একটা বড় কারণ হতে পারে নারী সুরক্ষার মতো ইস্যুতে তৃণমূল কংগ্রেসের চরম ব্যর্থতা। দু-বছর আগেকার আরজিকর আন্দোলন এবারের ভোটে অবশ্যই প্রভাব ফেলেছে। যার একটা বড় প্রমাণ পানিহাটির মতো তৃণমুলের শক্ত ঘাঁটিতেও আরজিকর নির্যাতিতার মা বিজেপি প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে এগিয়ে রয়েছেন।
২. এসআইআর বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের ফলে যে ৯০ লক্ষের বেশি নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাতে তৃণমূল কংগ্রেসই যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। এই তালিকায় লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটার বাদ পড়েছেন সেটা যেমন ঠিক, আবার বহু ভুয়া বা মৃত ভোটারের নাম যে বাদ পড়েছে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।
৩. পনের বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনে যে পরিমাণ দুর্নীতি, অপশাসন, দৈনন্দিন জীবনে কাটমানি ও সিন্ডিকেট রাজের বাড়বাড়ন্ত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগে উঠেছে, তা পশ্চিমবঙ্গে আর কোনো আমলে উঠেছে কি না সন্দেহ।
এবারও এসআইআরের কারণে রাজ্য জুড়ে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের যে অমানুষিক ভোগান্তি হয়েছে সেটাকে প্রচারের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন মমতা। এজন্য কোনো চেষ্টাই বাদ রাখেননি তিনি, কিন্তু দেখা গেল দুর্নীতি ও ব্যর্থতার অভিযোগকে ঢাকতে তা যথেষ্ঠ হল না।
৪. রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন মমতা বন্দোপাধ্যায়ের একটানা নির্বাচনী সাফল্যের পেছনের একটা বড় কারণ হল রাজ্যের মুসলিমদের প্রায় একচেটিয়া সমর্থন তিনি পেয়ে এসেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি মুসলিম, আর এর মধ্যে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ভোটই বরাবর তৃণমূল কংগ্রেস পেয়ে এসেছে। কিন্তু এবারে সেই প্রক্রিয়ার পাল্টা একটা হিন্দু ভোটের ‘কনসলিডেশন’ হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে, যার সুফল বিজেপি পেয়েছে। এ কারণে বিজেপি মুসলিম-গরিষ্ঠ জেলা মালদা বা মুর্শিদাবাদেও বেশ কিছু আসন পেতে চলেছে।
৫. পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজ্যের শাসক দল ভোটের সময় কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে, যেটা এবারে তৃণমূল কংগ্রেস পায়নি বললেই চলে। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরের মুহূর্ত থেকেই জাতীয় নির্বাচন কমিশন রাজ্য প্রশাসনের হাত রাশে তুলে নিয়েছে, ঢালাওভাবে জেলা শাসক ও পুলিশ সুপারদের বদলে দিয়েছে তারা।
সেই সঙ্গে ভোটের বেশ কদিন আগে থেকেই রাজ্যে দুই লাখ ৪০ হাজারের বেশি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এই বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির কারণেই ভোট এতো শান্তিপূর্ণ হয়েছে এবং মানুষ এতো নিশ্চিন্তে ও নিরুপদ্রবে ভোট দিতে পেরেছেন।
অন্যভাবে বললে, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকাও তৃণমূল কংগ্রেসের বিপক্ষেই গেছে।