হোয়াইট হাউসে এক রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ‘এইচএমএস ট্রাম্প’ নামের একটি সাবমেরিনের ঘণ্টা উপহার দিয়েছেন। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রশান্ত মহাসাগরের যুদ্ধে অংশ নেওয়া একটি সাবমেরিনের টাওয়ারের ঘণ্টা। রাজা বলেন, এই উপহার দুই দেশের ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যতের’ প্রতীক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘পৃথিবীর অন্য যেকোনো বন্ধুত্বের চেয়ে আলাদা’ বলে উল্লেখ করেন।
এর আগে রাজা কংগ্রেসে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব এখন আগের চেয়ে ‘আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ’। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি যুক্তরাজ্যের ‘সর্বোচ্চ সম্মান ও বন্ধুত্বের’ কথা জানান। একই সঙ্গে তার মা রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ১৯৯১ সালে একই কক্ষে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সে কথা স্মরণ করেন তিনি। অন্যদিকে ইরানের বিষয়ে ট্রাম্প তার ভাষণে জানান, ‘আমরা কখনোই সেই প্রতিপক্ষকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেব না।’
হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে রাজা ও রানির জন্য এই রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। সোমবার থেকে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি ক্যামিলা পার্কার।
ট্রাম্পকে কেন ঘণ্টা উপহার দিয়েছেন রাজা
রাজা চার্লস যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে একটি বিশেষ উপহার দিয়েছেন, যেটি এই দুই দেশের সামরিক জোটের গুরুত্বকেও তুলে ধরে। তিনি তাকে ‘এইচএমএস ট্রাম্প’ নামের একটি যুদ্ধকালীন সাবমেরিনের আসল ঘণ্টাটি উপহার দেন। ১৯৪৪ সালে প্রথম চালু হওয়া রাজকীয় নৌবাহিনীর সাবমেরিনের টাওয়ারের ঘণ্টা এটি।
রসিকতা করে রাজা বলেন, ‘আর যদি কখনো আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান… তাহলে শুধু ঘণ্টাটি বাজালেই হবে!’
সাবমেরিনটির নামের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের নামের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে বাকিংহাম প্যালেস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই ঘণ্টাটি মূলত দুই দেশের ‘বন্ধুত্বের নতুন অধ্যায়ের প্রতীক।’
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এই উপহারটি ১৯৭৬ সালে রানি এলিজাবেথের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় উপহার দেওয়া দ্বিশতবার্ষিকী লিবার্টি বেলের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
একই সঙ্গে কানাডার বিষয়ে নিজের ভূমিকার কথা ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দেন তিনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর যে দাবি করেছিলেন তাতে অসন্তুষ্ট ছিলেন কানাডীয়রা। তাই রাজা যখন নিজের কানাডার রাজা পরিচয়ের কথা উল্লেখ করেন, তখন সেসব নাগরিক খুশি হয়েছিলেন। রাজা বলেন, ‘খেলাধুলার ক্ষেত্রে, মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে বিশ্বকে স্বাগত জানাবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। তাই এক অর্থে, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আমরা দুজনই এই আয়োজনের যৌথ আয়োজক!’
‘প্রযুক্তিগত ও সামরিক সহযোগিতা দৃঢ়’ করতে রাজা ন্যাটো ও অকাসের জোটের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। রাজা তৃতীয় চার্লস বলেন, ‘যাতে আমরা একত্রে এই ক্রমবর্ধমান জটিল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারি।’
ট্রাম্প একটি সমৃদ্ধ উত্তরাধিকারের মতো ‘অসাধারণ উপহার’ দেওয়ার জন্য যুক্তরাজ্যকে ধন্যবাদ জানান। ট্রাম্প বলেন, ব্রিটেনের সাবেক উপনিবেশগুলোর বেশির ভাগই জানে না যে তারা যুক্তরাজ্যের কাছে কতটা ঋণী। তিনি আরও বলেন, ‘ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার জন্য আমাদের দুই দেশ সারাজীবন যেন একসঙ্গে থাকে।’
এরপর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছরের স্বাধীনতা উদযাপন এবং একজন ‘মহান ব্যক্তি’ রাজা চার্লসের সম্মানে পানীয় পানের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানান। এই নৈশভোজ ‘আমাদের দেশের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নিজের দেশের ইতিহাসের কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের দৃষ্টিতে স্বাধীনতা যুদ্ধ ব্রিটিশ ঐতিহ্যকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য নয়, বরং সেটিকে ‘পুনরুদ্ধার ও নিখুঁত করার জন্য’ করা হয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ছিল যুগের এক অলৌকিক ঘটনা, যেটি স্বায়ত্তশাসন ও মানুষের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি সুদূরপ্রসারী বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিল।’
ইরানের বিষয়ে ট্রাম্প যা বলেন
একই সঙ্গে ট্রাম্প তার বক্তব্যে ‘দুই-একটি ভিন্ন প্রসঙ্গ’ তুলে ধরেন। যেমন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। এ যুদ্ধ নিয়ে সংক্ষিপ্ত এক বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব ভালো করছে’। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সামরিকভাবে সেই বিশেষ প্রতিপক্ষকে পরাজিত করেছি। আমরা কখনোই সেই প্রতিপক্ষকে, চার্লস আমার সঙ্গে আমার চেয়েও বেশি একমত যে আমরা কখনোই সেই প্রতিপক্ষকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেব না।’
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ঐক্যবদ্ধভাবে ‘কমিউনিজম, ফ্যাসিজম ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিজয়ী বেশে রুখে দাঁড়িয়েছে’ বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও বন্ধনকে ‘পৃথিবীর অন্য যেকোনো সম্পর্কের চেয়ে আলাদা এক বন্ধুত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেন ট্রাম্প। এই সম্পর্ক ‘খুবই বিশেষ ও অবিশ্বাস্য’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মার্কিন অনেক অঙ্গরাজ্য ও শহরের নাম এখনো যুক্তরাজ্যের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের চিহ্ন বহন করছে বলেও উল্লেখ করেন ট্রাম্প। উদাহরণ হিসেবে নিউ ইয়র্কের কুইন্সের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, সেখানে বেড়ে উঠেছেন তিনি।