মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের তীব্রতা যদি মে মাসের মধ্যে কমে আসে, তাহলেও এ বছর জ্বালানির দাম ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এটি চার বছর আগে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি হবে বলে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
এক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিশ্বব্যাংক তাদের সর্বশেষ কমোডিটি মার্কেটস আউটলুকে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যদি সংঘাত আরও বাড়ে এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে নিত্যপণ্যের দাম আরও আকাশচুম্বী হতে পারে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক এই সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল অক্টোবর নাগাদ যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। তবে তেলের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকিই এখন সবচেয়ে বেশি।
এদিকে জ্বালানি ও সারের আকাশচুম্বী দাম এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর রেকর্ড মূল্যের কারণে চলতি বছরে সামগ্রিকভাবে নিত্যপণ্যের দাম ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবারও তেলের দাম ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ইরান যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা থমকে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদক দেশগুলো থেকে জ্বালানি তেল, সার ও অন্যান্য পণ্য বিশ্ববাজারের ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার ফলে ইতিহাসে তেলের সরবরাহে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে। যুদ্ধের আগে সমুদ্রপথে সরবরাহকৃত অপরিশোধিত তেলের ৩৫ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম বছরের শুরুর চেয়ে ৫০ শতাংশের বেশি ছিল।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ব্রেন্ট তেলের গড় দাম হবে ব্যারেলপ্রতি ৮৬ ডলার, যা ২০২৫ সালে ছিল ৬৯ ডলার।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলো যদি যুদ্ধের কারণে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রপ্তানি স্বাভাবিক হতে সময় লাগে, তাহলে এ বছর তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ একের পর এক ঢেউয়ের মতো বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত হানছে। প্রথমে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, এরপর খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং সবশেষে উচ্চ মূল্যস্ফীতি; যা সুদের হার বাড়িয়ে দেবে এবং ঋণ গ্রহণকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলবে।’
এই অর্থনৈতিক ধাক্কা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে দরিদ্র দেশগুলোকে, যা উচ্চ ঋণে জর্জরিত উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংকট আরও বাড়িয়ে দেবে।
খাদ্য সরবরাহে চাপের আশঙ্কা
২০২৬ সালে সারের দাম ৩১ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বহুল ব্যবহৃত নাইট্রোজেন সার ইউরিয়ার দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে অ্যামোনিয়া ও কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরির মাধ্যমে এই সার উৎপাদিত হয়।
সারের দাম বাড়লে খাদ্য সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হবে, যা কৃষকদের আয় কমিয়ে দেবে এবং ফসলের ফলন হুমকির মুখে ফেলবে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ধারণা করছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এ বছর আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ২০২৬ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে, যা যুদ্ধপূর্ব পূর্বাভাসের চেয়ে এক শতাংশ বেশি।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। এর ফলে প্রবৃদ্ধিও বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস থাকলেও তা কমে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নামতে পারে।