ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক বিশাল বোমা ফাটলো। দেশটির কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’-এর সাবেক প্রধান তামির পার্দো ফাটালেন সেই বোমা। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর বর্বরতাকে নাৎসি জার্মানির ‘হলোকাস্ট’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন পার্দো। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) মিডল ইস্ট মনিটরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পার্দোর এই বিস্ফোরক মন্তব্য উঠে এসেছে।
মোসাদের সাবেক এই প্রধান খোলাখুলিভাবে স্বীকার করেছেন যে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েল যা করছে তা হলো একটি বর্ণবাদী শাসন। তিনি বলেন, ইসরায়েলি দখলদাররা যেভাবে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা চালাচ্ছে এবং তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করছে, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিদের ওপর নাৎসিদের চালানো নির্যাতনের কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘বর্তমানে এই শাসনব্যবস্থার অধীনে ইহুদি পরিচয় দিতে আমি লজ্জিত বোধ করছি।’
পার্দো উল্লেখ করেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও কট্টরপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা কোনো আন্তর্জাতিক আইন মানছে না। সেখানে ফিলিস্তিনিদের জন্য এক আইন এবং ইহুদিদের জন্য অন্য আইন চলছে।
তামির পার্দোই প্রথম নন। অতীতে ইসরায়েলের আরও অনেক শীর্ষ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, আমি আইয়ালন। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেট এর এই সাবেক প্রধান একাধিকবার বলেছেন যে, ফিলিস্তিনিদের ওপর যে দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে তা ইসরায়েলের জন্যই দীর্ঘমেয়াদী হুমকি। তিনি ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে সরব ছিলেন।
এ ছাড়া আভি ডিচটারও শিন বেটের সাবেক প্রধান ছিলেন। তিনি এক সময় স্বীকার করেছিলেন যে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে একটি জাতিকে দমন করা অসম্ভব। ২০১২ সালে নির্মিত দ্য গেট কিপার্স নামের বিখ্যাত এক প্রামাণ্যচিত্রেও শিন বেটের ছয়জন সাবেক প্রধানকে একসাথে দেখা যায়। তারা সবাই একমত হয়েছিলেন যে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব অমানবিক এবং এটি ইসরায়েলের নৈতিকতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো অকথ্য নির্যাতনের বিশদ বর্ণনা দিয়েছিলেন।
শিন বেটের সাবেক আরেকজন প্রধান বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের কড়া সমালোচক ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইসরায়েল সরকার শান্তি চায় না, বরং তারা ফিলিস্তিনিদের ভূমি জবরদখল করতে এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ করতে ব্যস্ত।
ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে বর্তমান বিশ্বের বহু মানবাধিকার সংস্থা 'মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ' হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
১৯৪৮ সালের পর থেকে ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনিদের ভূমি জবরদখল করছে, যা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ। তারা বেসামরিক জনগণের ওপর ড্রোন হামলা, ফসলের ক্ষেত পুড়িয়ে দেওয়া এবং সুপেয় পানি বন্ধ করার মতো জঘন্য অপরাধ করে যাচ্ছে।
সর্বশেষ সাবেক মোসাদ প্রধান তামির পার্দোর মতো থিংক ট্যাংকদের এমন ক্ষোভ প্রমাণ করে যে, ইসরায়েলিদের অপরাধের মাত্রা এখন এতটাই চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাদের খোদ গোয়েন্দা প্রধানরাই আর চুপ থাকতে পারছেন না। পার্দো যে ইহুদি হিসেবে লজ্জিত হওয়ার কথা বলেছেন, তা আসলে ফিলিস্তিনি জনগণের দীর্ঘদিনের আর্তনাদ এবং সংগ্রামের এক চরম সত্যের প্রতিফলন।
বিশ্ব আজ দেখছে, যারা এক সময় হলোকাস্টের শিকার হয়েছিল, তাদের উত্তরসূরিরাই আজ অন্য একটি জাতির ওপর আধুনিক ‘হলোকাস্ট’ চালিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা, বিবিসি