পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আপাতত প্রশ্নের মুখে পড়ল।
আলোচনার আগে, পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তাদের বেশ আশাবাদী ভঙ্গিমায় কথা বলতে শোনা গিয়েছিল। তারা জোর দিয়ে বলছিলেন যে, পাকিস্তানের উপর উভয় পক্ষের আস্থা রয়েছে যা অন্যদের নেই।
মার্কিন প্রতিনিধিদলের প্রধান ও দেশটির ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও বেশ আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু রোববার (১২ এপ্রিল) রাতভর আলোচনা হওয়ার পরে তিনি ঘোষণা করেন যে, আলোচনা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে।
আলোচনায় একাধিক বিষয় অমীমাংসিতই রয়ে যায় যার মধ্যে অন্যতম হলো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। এই বিষয়গুলিতে একমত হতে পারেনি দুই পক্ষ। মতবিরোধের কারণে আলোচনা ভেস্তে যায়। তাহলে, এই সংঘাতের পরিণতি কী দাঁড়াল এবং যুদ্ধের প্রধান পক্ষগুলোর সামনে এখন কী বিকল্প রয়েছে?
গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা
বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিজ ডুসেট উল্লেখ করেছেন, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনাগুলো ছিল ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রথম আলোচনা। এ ধরনের কূটনীতি এক দিনে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। আলোচনা শুরুর আগেই এমন কিছু লক্ষণ দেখা গিয়েছিল, যা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে এই প্রক্রিয়ায় দ্রুত নিষ্পত্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে না।
লিজ ডুসেট জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবেই কঠোর ভাষা ব্যবহার করে আসছেন। ইরান পরাজিত হয়েছে। ইরানের আত্মসমর্পণ করা প্রয়োজন ট্রাম্পের এসব মন্তব্যের সুরেই কথা বলেছেন জেডি ভ্যান্স।
তিনি বলেন, ‘তাদের (তেহরানকে) অবশ্যই আমাদের শর্তগুলো মেনে নিতে হবে। কারণ, পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায় ইরান সামরিক ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং তাদের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অনেকেই গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন।’
তবে ডুসেট উল্লেখ করেন যে, ইরানকে আল্টিমেটাম দিলেই যে তারা নতি স্বীকার করবে, এমন সম্ভাবনা কম। এ ছাড়া ইসলামাবাদে ইরান আত্মসমর্পণের মানসিকতা নিয়ে আসেনি। ইরান যখন ইসলামাবাদে পৌঁছায়, তখন তারা নিজেদের এই যুদ্ধে পরাজিত বলে মনে করেনি। তারাই আসলে জয়লাভ করছে, এমন বিশ্বাস নিয়ে ইরান আলোচনা শুরু করে। ইরান মনে করে যে, আলোচনার টেবিলে তাদের অবস্থান বেশ শক্তিশালী। তারা এখনও পাল্টা আঘাত হেনে চলেছে এবং হরমুজ প্রণালিকে একটি কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কোনদিকে?
উভয় পক্ষ কি তাদের নিজ নিজ রাজধানীতে ফিরে গিয়ে কূটনীতির জন্য আরও কিছুটা সময় দেবে? নাকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনই ফের পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার পক্ষে উপযুক্ত সময় বলে মনে করবেন?
ইরানে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত নিকোলাস হপটন মনে করেন, ইসলামাবাদে যা ঘটেছে, তা থেকে ইতিবাচক কিছু ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, দুই পক্ষই বিষয়টি বেশ গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মোকাবিলা করেছ। তারা লম্বা সময় ধরে আলোচনা চালিয়েছে। আলোচনার ধরন এমন ছিল যে, সেখানে বিবৃতি প্রদানের পাশাপাশি অনেক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগও ছিল।
তিনি জানান, ইসলামাবাদে উভয় পক্ষই তাদের সর্বোচ্চ দাবি দাওয়া পেশ করেছে। তবু তাদের মধ্যকার মতপার্থক্য এখনো বেশ গভীর। উভয় পক্ষকেই ভবিষ্যতে আরও আলোচনার ব্যাপারে আশাবাদী বলেই মনে হয়েছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ইরানের সাথে সম্পাদিত চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে হপটন বলেন, যদি শেষমেশ আদৌ কোনো চুক্তি সম্পাদিত হয়, তবে এতে নতুন কিছু বিষয় যুক্ত থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। এ ছাড়া এটি ২০১৫ সালের চুক্তির চেয়ে অধিক জটিল হবে।
বিবিসি নিউজ পার্সিয়ানের বিশেষ সংবাদদাতা কাসরা নাজি-ও একই অভিমত প্রকাশ করে বলেন, ‘সব আশা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। আলোচনায় ইরানি প্রতিনিধিদলের প্রধান মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ একটি টুইট করেছেন। সেখানে তিনি আলোচনার এই পর্বে ইরানি প্রতিনিধিদলের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার জন্য মার্কিন পক্ষকে দায়ী করেছেন। তবে একই সাথে তিনি ভবিষ্যতে আরও আলোচনার সম্ভাবনাও জিইয়ে রেখেছেন।’
বিবিসি জানতে পেরেছে যে, আনুষ্ঠানিক আলোচনা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানি ও মার্কিন প্রতিনিধিদের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন বা ইরানি কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেনি। আর বিগত বছরে অনুষ্ঠিত আলোচনাগুলোর মতোই, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত আলোচনার প্রকৃত স্বরূপ বোঝাটা বরাবরই কঠিন। তবে এর মাধ্যমে হয়তো এই ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে যে, মধ্যস্থতা ও ব্যাক-চ্যানেল অর্থাৎ নেপথ্য আলোচনার দরজা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
তাহলে কি ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আর ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা হবে না? অথবা ট্রাম্প কি এখন আরও ধৈর্যশীল ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন? কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, হ্যাঁ। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের প্রভাব বা লেভারেজ এখনো অটুট রয়েছে।
কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে বিশ্ব বাণিজ্যে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত, ইরানের নেতৃত্ব ও তাদের প্রক্সি অর্থাৎ অনুগত গোষ্ঠীগুলোর টিকে থাকা এবং তাদের কাছে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত থাকা।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা, তাসনিম একটি সুত্র উল্লেখ করে জানিয়েছে, আলোচনার ব্যাপারে ইরানের কোনো তাড়াহুড়ো নেই। বল এখন আমেরিকার কোর্টে।
বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা আজাদেহ মোশিরি জানান, বড় শিক্ষাটি হলো, ইরানে নিছক বলপ্রয়োগ করে তাদের আমেরিকাকে ছাড় দেওয়ার মতো কোনো অবস্থানে ঠেলে পাঠানো যায়নি।
অন্যান্য প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প ইরানের ওপর নৌ-অবরোধের অভিযোগ আনার বিষয়টি বিবেচনা করছেন, এই পরিস্থিতি অনেকটা গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রস্তুতিকালে নেওয়া পদক্ষেপের মতোই।
সপ্তাহান্তে যখন আলোচনা চলছিল, সম্ভবত এই বিষয়টি ইঙ্গিত করেই তখন যুক্তরাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। সেই বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালীর অবরোধ তুলে নিয়ে সক্রিয়ভাবে জলপথ উম্মুক্ত করার মাধ্যমে একটি নিরাপদ সামুদ্রিক করিডোর প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা পুনরায় শুরু হওয়ায় এই পদক্ষেপটি আদৌ নেওয়া সম্ভব কি না, সেই বিষয়টি এখনো অস্পষ্ট।
বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিজ ডুসেট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দুটি বিষয় সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত। প্রথমত, যুদ্ধের পথে ফিরে যাওয়া আমেরিকার মানুষ খুব ভালোভাবে নেবেন না। আশা করা যায়, দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বব্যাপী কোনো সংঘাতের অভ্যন্তরীণ প্রভাব সম্পর্কে ট্রাম্প অবগত আছেন। বিশেষ করে যদি নভেম্বরে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্দিষ্ট কিছু পণ্য ও সেবার মূল্যের ওঠানামা পরিমাপ করে যে সূচক, তাকে বলা হয় কনজিউমার প্রাইস ইন্ডেক্স বা সিপিআই। ইতিমধ্যেই সিপিআই গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে; এটি ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে, তার একটি উদ্বেগজনক ইঙ্গিত। দ্বিতীয়ত, এই কৌশল কাজে আসবে না। ইরান নিশ্চিতভাবেই পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।’