৩ এপ্রিল, ২০২৬। ঘড়ির কাঁটায় তখন মধ্যরাত। দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের রুক্ষ ও দুর্গম পাহাড়ী অঞ্চল। আকাশ চিরে ধেয়ে এলো একটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র। মুহূর্তের ব্যবধানে মার্কিন দম্ভের প্রতীক ‘এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল’ আগুনের পিণ্ড হয়ে আছড়ে পড়ল ইরানি মাটিতে। কিন্তু এটি কেবল একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার গল্প নয়; বরং এটি ছিল পরের ৪৮ ঘণ্টার এক মহাপ্রলয়ের সূচনা। মার্কিন দম্ভ বিচূর্ণ হওয়ার এই নজীর পৃথিবীকে করল বিস্মিত! শুরু হলো খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজা। সিআইএর মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের পালা এবার।
বিস্ফোরণের ঠিক আগ মুহূর্তে নিরাপদে বের হতে পেরেছিলেন দুই মার্কিন ক্রু। পাইলটকে তাৎক্ষণিক উদ্ধার করা গেলেও বিপত্তি বাধে দ্বিতীয়জনকে নিয়ে, যিনি ছিলেন ‘ওয়েপনস সিস্টেমস অফিসার’। পাহাড়ের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যান তিনি। পেন্টাগনের কপালে তখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ। এই সেনার স্মৃতিতে রয়েছে মার্কিন যুদ্ধ পরিকল্পনার অতি-গোপন সব ব্লু-প্রিন্ট। তিনি ইরানিদের হাতে পড়া মানেই যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় নিশ্চিত।
সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) তখন এক অদ্ভুত ‘সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার’ শুরু করে। ইরানের অভ্যন্তরে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়—মার্কিন কমান্ডোরা তাকে ইতোমধ্যে উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। লক্ষ্য ছিল একটাই—ইরানি সেনাদের বিভ্রান্ত করা।
আহত গোড়ালি নিয়ে অন্ধকার রাতে সাত হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ শুরু করেন সেই নিঃসঙ্গ আমেরিকান। পেছনে আইআরজিসির ড্রোন আর শিকারি কুকুর। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন মরিয়া। একদিকে পেন্টাগন, অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের স্নায়ুচাপ। সিআইএ তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে পাহাড়ের এক গভীর ফাটলে সেই ‘অদৃশ্য’ সেনাকে শনাক্ত করে। ঠিক যেন খড়ের গাদায় হারিয়ে যাওয়া একটি সুঁচ।
উদ্ধার অভিযান শুরু হতেই ইরানের আকাশ হয়ে ওঠে যুদ্ধের ময়দান। একে একে ভূপাতিত হতে থাকে মার্কিন বিমান। একটি এ-১০ ওয়ারথগ, একটি এমএইচ-৬ লিটল বার্ড হেলিকপ্টার ও দুটি দানবীয় সি-১৩০ হারকিউলিস পরিবহন বিমান ধ্বংস হয়ে যায়। মুখ রক্ষা করতে পেন্টাগন দাবি করছে, তারা নিজেরাই বিমানগুলো ধ্বংস করেছে, যাতে প্রযুক্তি ইরানিদের হাতে না পড়ে। কিন্তু খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই শুরু হয় সমালোচনা। সাবেক নেভি সিল কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল উইলিয়াম ম্যাকক্র্যাফিন ক্ষোভে ফেটে পড়ে ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি আমাদের সন্তানদের সামনে আমাদের লজ্জিত করেছেন, আপনিই আমাদের নিয়তি।’
আইআরজিসির মুখপাত্রের কণ্ঠে তখন বিজয়ের সুর। তিনি দাবি করেন, ইসলামের বীর যোদ্ধাদের ক্রোধের আগুনে পুড়ছে শত্রুর দম্ভ। তারা ধ্বংসস্তূপের ছবি প্রকাশ করে দাবি করে, মার্কিনিদের উদ্ধার অভিযান চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দক্ষিণ ইসফাহানের মাটিতে তখনো জ্বলছিল মার্কিন ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারের অবশিষ্টাংশ।
অন্যদিকে ৫ এপ্রিলের ভোরে সেই মার্কিন সেনাকে জীবিত উদ্ধার করে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার দাবি করে ওয়াশিংটন। কিন্তু বিনিময়ে যা হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তার আর্থিক ও সামরিক মূল্য কি আদৌ ওই এক সেনার জীবনের সমান? এসব সমরযান ও সমরাস্ত্র তো মার্কিন আত্মঅহংকার ও শক্তিমত্তারও প্রতীক।
হলিউড সিনেমার মতো এই মিশনে যুক্তরাষ্ট্র তাদের এক সেনাকে হয়তো ফিরে পেয়েছে, কিন্তু বিশ্বমঞ্চে তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বে বড় একটি দাগ লেগে গেল। ইরানের দুর্গম পাহাড়ে সি-১৩০ বিমানের সেই জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ আজ একটি বড় প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে—প্রযুক্তির উৎকর্ষতা কি সবসময় নিয়তিকে হারাতে পারে?
যেখানে ২০ কোটি ডলারের যুদ্ধবিমান মুহূর্তেই ছাই হয়ে যায়, যেখানে দক্ষ কমান্ডোরা প্রাণ হাতে নিয়ে লেজ গুটিয়ে ফিরে আসে, সেখানে বিজয় আর পরাজয়ের রেখাটি অত্যন্ত ক্ষীণ। ৩ এপ্রিলের সেই ‘ব্ল্যাক নাইট’ বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিল—যুদ্ধ কেবল বীরত্বের নয়, অনেক সময় তা চরম অনিশ্চয়তা আর নিয়তির এক নিষ্ঠুর খেলা।