সুদানের দারফুর অঞ্চলের একটি হাসপাতালে হামলায় অন্তত ৬৪ জন নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ১৩ জন শিশু রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুসের বরাতে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
শনিবার (২১ মার্চ) সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, শুক্রবার রাতে পূর্ব দারফুর রাজ্যের রাজধানী আল-দাঈনে অবস্থিত আল-দাঈন টিচিং হাসপাতালে এই হামলা চালানো হয়। নিহতদের মধ্যে একাধিক রোগী, দুই নারী নার্স ও একজন পুরুষ চিকিৎসকও রয়েছেন।
এ ছাড়া আরও ৮৯ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে আটজন স্বাস্থ্যকর্মী। হামলায় হাসপাতালের শিশু, মাতৃত্ব ও জরুরি বিভাগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে এবং শহরের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ হয়ে গেছে।
ডব্লিউএইচও প্রধান বলেন, ‘এই মর্মান্তিক ঘটনার ফলে সুদানের যুদ্ধে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট মৃত্যুর সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। প্রায় তিন বছর ধরে চলা সংঘাতে এখন পর্যন্ত ২১৩টি হামলায় দুই হাজার ৩৬ জন নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে ডব্লিউএইচও।’
সুদানের মানবাধিকার সংগঠন ইমার্জেন্সি লয়ার্স জানায়, ‘এটি ছিল সেনাবাহিনীর ড্রোন হামলা।’
২০২৩ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এই সংঘাত দ্রুত বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবসৃষ্ট সংকটে পরিণত হয়েছে। এতে অন্তত হাজার দশেক মানুষ নিহত, এক কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত ও তিন কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তায় পড়েছে।
বর্তমানে দারফুর অঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকা আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে, আর দেশের পূর্ব, কেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চল সেনাবাহিনীর দখলে রয়েছে। উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে দারফুরে আরএসএফের কর্মকাণ্ডে গণহত্যার লক্ষণ রয়েছে বলে জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন।
ডব্লিউএইচওর সারভেইলেন্স সিস্টেম ফর অ্যাটাকস অন হেলথ কেয়ার (এসএসএ) জানায়, শুক্রবারের হামলায় ভারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে ও এতে শুধু হাসপাতাল নয়, কর্মী, রোগী, সরঞ্জাম ও মজুদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও সংস্থাটি কোনো পক্ষকে দায়ী করেনি।
তথ্য অনুযায়ী, সুদানে স্বাস্থ্যসেবায় হামলা ক্রমেই প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। ২০২৩ সালে ৬৪টি হামলায় ৩৮ জন নিহত হলেও, ২০২৪ সালে ৭২টি হামলায় ২০০ জন ও ২০২৫ সালে ৬৫টি হামলায় এক হাজার ৬২০ জন নিহত হন, যা বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যখাতে হামলায় মৃত্যুর ৮২ শতাংশ।
এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক সাম্প্রতিক ড্রোন হামলায় আট দিনে ২০০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলো এখন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিস্ফোরক অস্ত্র বহনে ক্রমেই শক্তিশালী ড্রোন ব্যবহার করছে।’
জাতিসংঘের মানবিক সংস্থাও এ হামলায় গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানায়, বারবার নিন্দা সত্ত্বেও যুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই হাসপাতালগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে আসছে।
ডব্লিউএইচও প্রধান বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবায় হামলা শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতিই নয়, দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনে। স্বাস্থ্যসেবা কখনোই লক্ষ্যবস্তু হওয়া উচিত নয়। শান্তিই সর্বোত্তম চিকিৎসা। যথেষ্ট রক্ত ঝরেছে, যথেষ্ট কষ্ট সহ্য করা হয়েছে। এখনই সময় সংঘাত প্রশমনের এবং বেসামরিক মানুষ, স্বাস্থ্যকর্মী ও মানবিক সহায়তাকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার।’