ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন—দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে রোববার (১ মার্চ) সকালে এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।
বিবিসি বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বলেছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এইমাত্র নিশ্চিত করেছে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি স্থানীয় সময় শনিবার ভোরে তার কার্যালয়ে মারা গেছেন। কান্নাভেজা কণ্ঠে দেওয়া এক ঘোষণায় ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের উপস্থাপক খামেনির মৃত্যুর খবর জানিয়ে বলেন, দেশটি ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও সাত দিনের সরকারি ছুটি পালন করবে।
এ ছাড়া ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের দেওয়া এক বিবৃতির বরাত দিয়ে দেশটির একাধিক রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বিবৃতিতে ৮৬ বছর বয়সী খামেনির মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। একই সঙ্গে কে তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন, সে সম্পর্কেও কিছু বলা হয়নি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সংবাদ চ্যানেল আইআরআইএনএনে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের আবহে খামেনির বিভিন্ন ছবি প্রচার করা হচ্ছে। পর্দার ওপরের বাঁ দিকের কোণে একটি কালো ব্যানারও দেখানো হচ্ছে। এর আগে উপস্থাপক ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের একটি বিবৃতি পাঠ করেন, যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় এবং তার মৃত্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করা হয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, খামেনির ‘শাহাদাত’ হবে ‘নিপীড়কদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এক অভ্যুত্থানের সূচনা’।
এর আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছিল, হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মেয়ে, জামাতা ও নাতিও নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, খামেনির এক পুত্রবধূও নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইরান খামেনির মৃত্যুর সংবাদ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মারা গেছেন বলে দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেন, ‘ইতিহাসের অন্যতম খারাপ মানুষ খামেনি মারা গেছেন।’
ট্রাম্পের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর খামেনি যে আর ‘নেই’, তার ‘লক্ষণ ক্রমশ বাড়ছে’ বলে দাবি করেছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার এই বক্তব্যের পর অসমর্থিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় খামেনি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে একজন ঊর্ধ্বতন ইসরায়েলি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া একটি সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার মার্কিন কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তেহরানে নিজ কম্পাউন্ডে চালানো হামলায় খামেনি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি নিউজ টুয়েলভ ও টাইমস অব ইসরায়েলসহ একাধিক ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর দাবি করেছে।
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এবিসি নিউজকে বলেছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান—দুজনই ‘সুস্থ ও নিরাপদে’ আছেন।
ইরানে শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা চালায়। এরপর পাল্টা জবাব দেয় ইরানও। মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই, দোহা, বাহরাইন ও কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইরানের বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও কমান্ডারকে হত্যা করেছে। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাত দিয়ে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক মানুষ নিহত ও অন্তত ৭০০ জন আহত হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সাল থেকে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন। তিনি দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন। জাতীয় পুলিশ ও নৈতিকতা পুলিশের (মোরালিটি পুলিশ) ওপরও তার কর্তৃত্ব ছিল।
খামেনি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) নিয়ন্ত্রণ করতেন, যারা দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে। এ ছাড়া এর স্বেচ্ছাসেবী শাখা বাসিজ রেজিস্ট্যান্স ফোর্সও তার নিয়ন্ত্রণে ছিল, যা মূলত ইরানে যেকোনো ধরনের ভিন্নমত বা বিক্ষোভ দমনে ব্যবহার করা হয়।