একসময় যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল ছিল প্রান্তিক একটি খেলা। আমেরিকান ফুটবল, বেসবল, বাস্কেটবল কিংবা আইস হকির ভিড়ে সকার নামে পরিচিত এই খেলাটি ছিল অনেকটাই উপেক্ষিত। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রাক্কালে সেই যুক্তরাষ্ট্রই কিনা আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরের প্রধান আয়োজক।
মাত্র ৩২ বছরে কীভাবে সকার থেকে ফুটবলে এমন পরিবর্তন ঘটল? প্রান্তিক থেকে কেন্দ্রে উঠে এল ফুটবল?
গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে সেই গল্প, একটি দেশের ফুটবল সংস্কৃতির ধীরে ধীরে বদলে যাওয়ার গল্প। ১৯৯৪ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো আধুনিক যুগের বিশ্বকাপ আয়োজন করে, তখন দেশটিতে কোনো জাতীয় পেশাদার ফুটবল লিগই ছিল না। জাতীয় দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড় ছিলেন সাবেক কলেজ ফুটবলার, আধা-পেশাদার কিংবা বিভিন্ন ছোটখাটো ক্লাবের খেলোয়াড়। বিশ্বকাপ আয়োজন সফল হবে কি না, তা নিয়েও ছিল প্রবল সন্দেহ। টিকিট বিক্রি হবে কি না, সেই উদ্বেগও ছিল আয়োজকদের মধ্যে।
কিন্তু সব শঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ১৯৯৪ বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সফল টুর্নামেন্টে পরিণত হয়। প্রায় ৩৫ লাখ দর্শক মাঠে বসে খেলা দেখেন। প্রতি ম্যাচে গড়ে প্রায় ৬৯ হাজার দর্শকের উপস্থিতির যে রেকর্ড তখন গড়েছিল, সেটি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসে অটুট রয়েছে।বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় প্রকৃত পরিবর্তন।
ফিফার শর্ত অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরু করে মেজর লিগ সকার বা এমএলএস। শুরুতে অনেকেই ভেবেছিলেন, এই লিগ বেশিদিন টিকবে না। কিন্তু তিন দশক পরে সেই এমএলএস ৩০ দলের শক্তিশালী প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। দেশজুড়ে ফুটবল-নির্দিষ্ট স্টেডিয়াম গড়ে উঠেছে। বর্তমানে ২২টি এমএলএস ক্লাব নিজেদের স্টেডিয়ামে খেলে।
একসময় যেখানে ফুটবলের কোনো শক্তিশালী অবকাঠামো ছিল না, সেখানে এখন যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনের অনুমোদিত পেশাদার দল রয়েছে ১২৭টি। এর মধ্যে পুরুষদের ১০২টি এবং নারীদের ২৫টি দল। পরিবর্তন শুধু মাঠেই নয়, অর্থনীতিতেও।
একসময় যে খেলাটিকে মার্কিন ক্রীড়া সংস্কৃতির প্রান্তিক অংশ মনে করা হতো, আজ সেটি বহু বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ফুটবল ক্লাবগুলোর তালিকায় এখন একাধিক এমএলএস ক্লাবের নাম রয়েছে। ফুটবলে বিনিয়োগ করছেন এনএফএল এবং অন্যান্য বড় ক্রীড়া লিগের মালিকরাও। আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে জনপ্রিয়তায়।
১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপের সময় আমেরিকার রাস্তায় ফুটবল জার্সি খুব একটা দেখা যেত না। আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। লিওনেল মেসির মতো বিশ্বতারকা এমএলএসে খেলছেন। ফুটবল এখন যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার ক্রীড়া সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।তবে সবাই যে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল অগ্রগতিতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট, তা নয়।
১৯৯৪ বিশ্বকাপে খেলা সাবেক মার্কিন তারকা এরিক ওয়েনালডা মনে করেন, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও খেলোয়াড় তৈরির ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে। তার মতে, মার্কিন ফুটবলে প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। সমালোচনা থাকলেও একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত, ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ না হলে আজকের মার্কিন ফুটবলও থাকত না।
ফিফার সাবেক সভাপতি জোয়াও হাভেলাঞ্জ বহু আগেই বুঝেছিলেন, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও প্রভাবশালী বাজারে ফুটবলকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে খেলাটির বৈশ্বিক বিস্তার আরও দ্রুত হবে। তার সেই পরিকল্পনারই অংশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ আয়োজন।এখন সেই পরিকল্পনার ফলাফল স্পষ্ট।
২০২৬ বিশ্বকাপ হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেবে। ম্যাচ হবে ১০৪টি। আয়োজক তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। টুর্নামেন্টের বেশিরভাগ ম্যাচই হবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে।
বিশ্বকাপকে সামনে রেখে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র নতুন জাতীয় ফুটবল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও চালু করেছে। আটলান্টার কাছে নির্মিত বিশাল এই কমপ্লেক্সকে দেশটির ফুটবল উন্নয়নের নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবু একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপ কি ১৯৯৪ সালের মতোই আরেকটি বিপ্লব ঘটাবে?
১৯৯৪ বিশ্বকাপ আমেরিকাকে উপহার দিয়েছিল এমএলএস। বদলে দিয়েছিল দেশটির ফুটবল মানচিত্র।
২০২৬ বিশ্বকাপের উত্তরাধিকার কী হবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে এটুকু নিশ্চিত, একসময় যে দেশে ফুটবল ছিল বহিরাগত খেলা, সেই দেশ আজ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আর সেই যাত্রার শুরু হয়েছিল ১৯৯৪ সালের এক গ্রীষ্মে।
সূত্র: আল জাজিরা, ফোরফোরটু, কেপিবিএস, রয়টার্স।