বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটেরও আয়োজন করা হয়েছিল। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশন জানায়, বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পেশ করা সেই প্রস্তাব।
হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন চার কোটি ৮০ লক্ষের বেশি ভোটদাতা। আর না ভোট দিয়েছেন দুই কোটি ২৫ লক্ষ। ফলে প্রশাসনিক ও নির্বাচনী সংস্কারের যে প্রস্তাব সনদে রয়েছে, তা বাস্তবায়িত করার কথা হবু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ অনুযায়ী চারটি বিষয়ের উপর ৮৪টি প্রস্তাবের ভিত্তিতে হয়েছিল ওই গণভোট। ২০২৫ সালের ৫ অগস্ট ক্ষমতার পালাবদলের বর্ষপূর্তিতে ৩৬ জুলাই উদযাপন শীর্ষক অনুষ্ঠানে জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। ওই ঘোষণাপত্র ছিল ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ অভ্যুত্থানের একটি দলিল, যার মাধ্যমে জুলাই গণ অভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার আমলে আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারের পাশাপাশি ওই সনদে সমালোচনা করা হয়েছে দুই সেনাশাসক, জিয়াউর রহমান (বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা তথা তারেক রহমানের পিতা) ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের (জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা) জমানারও। জুলাই গণ অভ্যুত্থানে নিহতদের জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণার কথাও বলা হয়েছে এই সনদে।
পাশাপাশি জুলাই সনদে রয়েছে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ৮৪ দফা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের ঘোষণা। এর মধ্যে ৪৭টি প্রস্তাবনা সাংবিধানিক ও ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার কথাও জানিয়েছে ইউনূস সরকার। গণভোটে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব থাকলেও তার মধ্যে কোনোটি নিয়ে বিএনপি, কোনোটি নিয়ে জামায়াতে ইসলামী আবার কোনোটি নিয়ে এনসিপির আপত্তি রয়েছে। জাতীয় ঐকমত কমিশনে এ বিষয়ে আপত্তিসূচক বক্তব্য (নোট অফ ডিসেন্ট) নথিভুক্ত করিয়ে রেখেছে তারা।
প্রথমে ইউনূস সরকারের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র গণভোট নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে প্রচার শুরু হয়েছিল। পরে অবশ্য সেই অবস্থান থেকে সরে এসে সরাসরি গণভোটে হ্যাঁর প্রচার শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার। নির্বাচনের আগে টিভি-রেডিওতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ইউনূস বলেছিলেন, ‘যদি হ্যাঁ ভোট দেন, বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে দেশ। নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে।’
গণভোটের হ্যাঁ যেসব বদল আনতে পারে
গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হওয়ায় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কার প্রস্তাবগুলি বাস্তবায়নের পথ খুলেছে। এতে প্রধানমন্ত্রীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কিছুটা খর্ব হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে বাড়বে। সাংবিধানিক পদে নিয়োগ হবে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, সরকার পরিচালনায় প্রায় সব নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য যে কোনও কাজ করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী।
কোনো বিষয়ে সংসদে ভোটাভুটির ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের উপর দলীয় নিয়ন্ত্রণের রাশ আলগা হবে, স্বাধীনতা বাড়বে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে বলে ইউনূস এবং তার সঙ্গীদের দাবি। হ্যাঁ জয়ী হওয়ায় আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। ফলে সংবিধান সংশোধন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসবে। কোনও একটি দলের প্রেক্ষিতে সংবিধান সংশোধন করা কঠিন হবে। প্রধানমন্ত্রীকে দলীয় শীর্ষনেতৃত্বের বাইরে রাখার প্রস্তাবও রয়েছে জুলাই সনদে।
মূল যে চারটি বিষয়ের উপর গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল, সেগুলি হল:
১. নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়া অনুসারে গঠন করা হবে।
২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলির প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলির ঐকমত হয়েছে, সেগুলি বাস্তবায়নে নির্বাচনে বিজয়ী দল বা জোট বাধ্য থাকবে।
৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে একটি প্রস্তাব হল, প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন কোনও ব্যক্তি আর সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের শীর্ষপদে থাকতে পারবেন না।
জামায়াত এবং এনসিপির চাপে ইউনূস সরকার জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নীতি জুলাই সনদের অন্তর্ভুক্ত করলেও তাতে গোড়া থেকেই তীব্র আপত্তি রয়েছে বিএনপির। পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রী দলীয় শীর্ষপদে থাকতে পারবেন না, এমন প্রস্তাবেরও বিরোধী তারা। সেক্ষেত্রে তারেক রহমান বিএনপির শীর্ষপদে থাকতে পারবেন না। তাই গত অক্টোবরে জুলাই সনদে সই করলেও এই দুই বিষয় নিয়ে ক্রমাগত উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন বিএনপি নেতৃত্ব।
এ সম্পর্কে দলের অবস্থানের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সম্প্রতি তারেক রহমানের দলের এক নেতা বলেছিলেন, ‘ধরুন আপনি অভুক্ত অবস্থায় রয়েছেন। আপনাকে খাবার টেবিলে নিয়ে গিয়ে বসানো হল। দেখলেন টেবিলে মাংস, রুটি, ফল এবং মদ রয়েছে। এর পরেই আপনাকে বলা হল, খেলে সবকিছু খেতে হবে। নইলে কিছুই খেতে পারবেন না! আপনি মদ খান না। এই পরিস্থিতিতে কী করবেন? জুলাই সনদের অনেক ভাল দিক থাকলেও কিছু বিষয় রয়েছে, যা আদর্শ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খায় না।’
এর পরেই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে গণভোটের সব হ্যাঁ বিএনপি মানবে না। জুলাই সনদের প্রস্তাব বলছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের (নবনির্বাচিত সাংসদ) সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। সংসদ সদস্যেরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংস্কার সম্পন্ন করবে। তবে পরিষদ নির্দিষ্ট সময়ে সংবিধান সংস্কার না করলে কী হবে, তার উল্লেখ নেই ইউনূস সরকারের জারি করা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত অধ্যাদেশে।
তবে বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের কোনও বৈধতা নেই। সংসদের সিদ্ধান্তই সেখানে চূড়ান্ত। ফলে গণভোটে হ্যাঁ জিতলেও জুলাই সনদের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ের অবকাশ থেকে গেল।