কোনো নির্বাচন হয়ে গেলে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে বিশেষ করে পরাজিত দলের পক্ষ থেকে ভোট চুরি, কারচুপি ও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ উঠে। ভোট কারচুপি এবং ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং উভয়ই নির্বাচনের ফলাফলকে অন্যায়ভাবে প্রভাবিত করার কৌশল, তবে এদের কাজের ধরন এবং প্রয়োগের সময় ভিন্ন।
সহজ ভাষায়, ভোট কারচুপি হলো ভোটের দিন বা তার আশেপাশে করা সরাসরি অপরাধ, আর ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হলো অনেক আগে থেকে পরিকল্পনা করে পুরো ব্যবস্থাকে নিজের পক্ষে নেওয়ার একটি সূক্ষ্ম ও কাঠামোগত প্রক্রিয়া।
ভোট কারচুপি বা ভোট রিগিং
এটি মূলত নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্র বা ব্যালট বক্সের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। এটি সাধারণত দৃশ্যমান ও বেআইনি।
যেভাবে কাজ করে:
ব্যালট পেপার ছিনতাই ও সিল মারা: প্রার্থীর সমর্থকরা জোর করে কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে নিজের প্রতীকে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে (যাকে 'বক্স ভরাট' বলা হয়)।
ভুয়া ভোট (প্রক্সি ভোট): মৃত ব্যক্তি বা প্রবাসীদের নামে অন্য কেউ ভোট দিয়ে দেওয়া।
ভোটকেন্দ্রে বাধা: প্রতিপক্ষের ভোটারদের ভয় দেখিয়ে কেন্দ্রে আসতে না দেওয়া বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও ভোট দিতে না দিয়ে বের করে দেওয়া।
গণনায় কারচুপি: ভোট গ্রহণ শেষে গণনার সময় প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে নিজের প্রার্থীর সংখ্যা বেশি লিখে দেওয়া বা প্রতিপক্ষের বৈধ ভোট বাতিল ঘোষণা করা।
ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং
এটি অনেক বেশি জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদী। এটি নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই শুরু হয় এবং অনেক সময় আপাতদৃষ্টিতে একে আইনি মনে হতে পারে। একে বলা হয় সিস্টেমিক ম্যানিপুলেশন।
যেভাবে কাজ করে:
সীমানা পুনর্নির্ধারণ: নির্বাচনী এলাকার সীমানা এমনভাবে পরিবর্তন করা যাতে প্রতিপক্ষের সমর্থকরা টুকরো টুকরো হয়ে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং নিজের সমর্থকরা এক জায়গায় সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকে।
দলীয় প্রশাসন নিয়োগ: নির্বাচনের সাথে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে (যেমন ডিসি, এসপি বা রিটার্নিং অফিসার) নিজেদের অনুগত কর্মকর্তাদের বসানো। ভোটে এরা গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করে।
ভোটার তালিকা ম্যানিপুলেশন: প্রতিপক্ষের সমর্থকদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া বা নিজের সমর্থকদের ভুয়া ঠিকানায় ভোটার করা।
প্রতিপক্ষকে দমন: নির্বাচনের আগে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দেওয়া, গ্রেপ্তার করা বা প্রচারণায় বাধা দিয়ে তাদের মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়া (যাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকে)।
মিডিয়া ও ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ: রাষ্ট্রীয় বা প্রভাবশালী মিডিয়া ব্যবহার করে একপাক্ষিক প্রচারণা চালানো এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো। এটি ভোটের আগের রাতে ব্যাপক পরিসরে গুজব ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার কাজটি করে।
এক নজরে পার্থক্য
বৈশিষ্ট্য: ভোট কারচুপি হয় মূলত ভোটের দিন বা আগের রাতে। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয় নির্বাচনের কয়েক মাস বা বছর আগে থেকে। কারচুপি হয় সরাসরি হস্তক্ষেপ ও পেশ পেশিশক্তির মাধ্যমে। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয় কৌশলগত, আইনি ও কাঠামোগত কারসাজির মাধ্যমে।
কারচুপির দৃশ্যমানতা খুব সহজে ধরা পড়ে (যেমন কেন্দ্রে মারামারি)। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং সহজে ধরা পড়ে না, সিস্টেমের ভেতর দিয়ে ঘটে। কারচুপির লক্ষ্য সরাসরি ভোটের সংখ্যা বাড়ানো। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয় ভোট হওয়ার আগেই জেতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে।
বর্তমান বিশ্বের রাজনীতিতে সরাসরি কারচুপির চেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বেশি দেখা যায়। কারণ কারচুপি করলে আন্তর্জাতিক মহলে বা আদালতের কাছে প্রমাণ দেওয়া সহজ, কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং এমনভাবে করা হয় যে বাইরে থেকে সবকিছু আইনি মনে হতে পারে।