অনিয়ম অনিঃশেষ-৮
## বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রযুক্তি অধিদপ্তরের অডিট প্রতিবেদন অবজ্ঞা ## ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও উচ্চ আদালতের রুল উপেক্ষা
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান? বিটিআরসি কি বাংলাদেশ ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ বা মন্ত্রণালয়ের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান? বিটিআরসি কি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের হিসাবের নিয়ন্ত্রণের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান? বিটিআরসি কি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান? বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের জবাবদিহীতার বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান কি বিটিআরসি?
সম্প্রতি বিটিআরসিতে কোনো প্রকার পরীক্ষাবিহীন ২৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ এবং তাদের পদোন্নতিতে তোড়জোড় শুরু হওয়ায় এই প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে। একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বিশ্বাসযোগ্যতা। বিটিআরসি সেই বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষায় কতটা উত্তীর্ণ, তা নিয়ে উঠেছে আরও গুরুতর প্রশ্ন।
জানা গেছে, দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের লাইসেন্স, স্পেকট্রাম বরাদ্দ, ইন্টারনেট নীতি, রাজস্ব আদায় ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো স্পর্শকাতর দায়িত্ব বহনকারী এই প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া এখন আদালতের কাঠগড়ায়, অডিট নথির পাতায় এবং কর্মকর্তাদের সংগঠিত ক্ষোভের কেন্দ্রে। প্রশ্নগুলো কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার পদের বিষয় নয়, বরং প্রশ্ন হলো— রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান কি সরকারের নীতিমালার বাইরে গিয়ে তার নিজের ভেতরের নীতিতে চলে?
সূত্র বলছে, বিটিআরসিতে বিগত ওয়ান ইলেভেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো প্রকার পরীক্ষা ছাড়াই বিধিবহির্ভূতভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত চার কর্মকর্তাকে পরিচালক পদে পদোন্নতি দিতে অস্বাভাবিক এবং নজিরবিহীন তৎপরতা চলছে। সরকারের তিনটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরা বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি সভা) সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এই পদোন্নতির সরাসরি আপত্তি জানালেও, সরকারি অডিট অধিদপ্তর ও শ্বেতপত্র কমিটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ওই নিয়োগগুলোকে ‘অবৈধ’ ও ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ ঘোষণা করলেও, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ একাধিকবার লিখিতভাবে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলেও, বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে রুল জারি হলেও বিটিআরসি কমিশন ওই কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথে অবিচল।
সূত্রমতে, এই পদোন্নতির বিষয়ে বিটিআরসি কমিশন কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে নিজস্ব আইনি ফার্মের মতামত। গত ২৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিটিআরসির ৩০৬তম কমিশন সভায় সেই মতামতের ভিত্তিতে অফিস আদেশের মাধ্যমে পদোন্নতি কার্যকরের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্র। সূত্র জানায়, এ বিষয়ে হাইকোর্টের রুলের জবাব দেওয়ার মেয়াদ দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো জবাব দাখিল করেনি। বরং হাইকোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করে চলছে পদোন্নতির মহোৎসব।
বিটিআরসি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, আলোচ্য ২৯ জনের মধ্যে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা চার কর্মকর্তা হলেন—সাবিনা ইসলাম (উপপরিচালক, লিগ্যাল), মো. দেলোয়ার হোসেন (উপপরিচালক, প্রশাসন), মো. রাইসুল ইসলাম (উপপরিচালক, স্পেকট্রাম) এবং ড. শামসুজ্জোহা (উপপরিচালক, ইঞ্জিনিয়ারিং)। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো প্রাথমিক নির্বাচনী পরীক্ষা (প্রিলিমিনারি), লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই সরকারি নিয়োগবিধি উপেক্ষা করে তারা প্রথমে ‘জুনিয়র পরামর্শক’ হিসেবে বিটিআরসিতে নিয়োগ পান।
অন্যদিকে সাবিনা ইসলাম এবং মো. দেলোয়ার হোসেনকে বিভাগীয় প্রার্থী দেখিয়ে নিয়োগ বিধি উপেক্ষা করে প্রকল্প থেকে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উভয়ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতামূলক লিখিত পরীক্ষা ব্যতিরেকে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে; যা বাংলাদেশ সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা সম্পর্কে মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত বিধির সরাসরি লঙ্ঘন।
২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রযুক্তি অধিদপ্তরের অডিট রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, এই ২৯ জনের নিয়োগে চাকরিবিধি, নিয়োগ পরীক্ষা ও প্রক্রিয়া কোনোটিই অনুসরণ করা হয়নি। বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রযুক্তি অধিদপ্তরের অডিটের ২০১৬-২০১৭ থেকে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রতিবেদনে এই নিয়োগগুলোর বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বারবার ব্যাখ্যা চাওয়ার পরেও বিটিআরসি অডিট অধিদপ্তরকে সন্তোষজনক কোনো জবাব দেয়নি।
জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পরিচালিত নিরীক্ষা প্রতিবেদন ২০২০ সালে প্রকাশিত হলে বিটিআরসির নিয়োগে অনিয়ম ধরা পড়ে। ২০২১ সালে প্রথম তদন্ত কমিটি গঠিত হয় এবং অনিয়মের প্রমাণ মেলে। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে আরও দুটি কমিটি গঠন করা হয়, যার প্রতিবেদন গতবছরের জানুয়ারিতে জমা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল দুদক বিটিআরসিতে অভিযান চালিয়ে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের প্রমাণ পায়। বিভিন্ন তদন্তে জুনিয়র পরামর্শকদের রাজস্ব খাতে বয়স শিথিলতার অপব্যবহার এবং প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে অনিয়মতান্ত্রিক নিয়োগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। গতবছর ৩০ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ বিটিআরসিকে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিলেও সেটি উপেক্ষিত হয়।
পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত টেলিযোগাযোগ খাতের শ্বেতপত্র কমিটিও এই নিয়োগগুলোকে ‘অবৈধ’ ও ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করে। শ্বেতপত্র কমিটি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কাছে দাখিল করা প্রতিবেদনে নিরীক্ষা দলিল-দস্তাবেজে এই নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে ওই বছরের ১০ আগস্ট ৯টি নির্দেশনা দেওয়া হয়, যার ৭ নম্বরে বলা হয়েছে—যাদের বিরুদ্ধে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত, তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এসবের পরও বিটিআরসি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, বরং চলছে পদোন্নতির উৎসব।
এসব বিষয়ে জানতে চেয়ে গত শনিবার (১৩ জুন) বিকেল ৫টার দিকে ডাক, টেলিযোগাযোগ, বিজ্ঞান, তথ্য এবং প্রযুক্তি অডিট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো: রবিউল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি আসলে না দেখে কিছু বলতে পারব না। আপনি একদিন আসেন, আমরা দেখে মতামত চাইলে আমরা আপনার সঙ্গে আনঅফিশিয়ালি শেয়ার করব। তারা অথরিটি, তারা কাজ করে, আমরা শুধু দেখি। নির্বাহীর মন্তব্যের গুরুত্ব আছে, আমাদের মন্তব্যের কোনো গুরুত্ব নেই।’
এসব বিষয়ে জানতে শনিবার (১৩ জুন) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে অতিরিক্ত হিসাব মহানিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ কবির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি অ্যাকাউন্টসে কাজ করি। যারা অডিটে আছে, তারা ভালো বলতে পারেন। আমি অ্যাকাউন্টসে। আমি তো আসলে না দেখে কিছুই বলতে পারব না। অনেক দিন অডিটে আমার পোস্টিং নেই।’
তিন মন্ত্রণালয়ের ‘না’
বিটিআরসি সূত্র জানায়, এই ২৯ জনের নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে বিটিআরসির নিজস্ব কমিশন সভার কার্যবিবরণীতে সরকারের তিনটি মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কথা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এই আপত্তি একবার নয়, চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি, ৩ ফেব্রুয়ারি এবং ৫ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিটিআরসির ডিপিসি সভায় তিন দফায় উচ্চারিত হয়। সভায় একাধিক সদস্যদের মতামতের বৈপরীত্য চোখে পড়ার মতো।
সভায় উপস্থিত বিটিআরসির একাধিক সূত্র জানায়, উল্লেখিত চারজনের পদোন্নতি প্রোফাইলে অডিট আপত্তি কোনো ব্যক্তিগত অডিট আপত্তি নয় বরং নিয়োগ প্রক্রিয়া সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক আপত্তি মর্মে ডিপিসি সভায় মতামত দেন কমিটির সভাপতি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মোঃ এমদাদ উল বারীসহ মহাপরিচালক (এসএম) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ আমিনুল হক, মহাপরিচালক (ইএন্ডও) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আজম পারভেজ এবং মহাপরিচালক (এসএস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মহিউদ্দিন। অর্থাৎ এই অডিট আপত্তি আমলে না নিয়ে উক্ত চার কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার ব্যাপারে অতিউৎসাহী ভূমিকা পালন করেন এই চারজন। তবে কমিটির বাকি পাঁচ সদস্য ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ আবু বকর ছিদ্দিক, মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোঃ মেহেদী উল-সহিদ এবং তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এই চারজনের মতামতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের লিখিত নির্দেশ অমান্য
বিটিআরসি সূত্র বলছে, প্রশাসনিক সভায় মৌখিক আপত্তির বাইরেও একাধিকবার বিটিআরসিকে এই ২৯ জনের নিয়োগ নিয়ে লিখিতভাবে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। কিন্তু বিটিআরসি কর্তৃপক্ষ সেসব চিঠিকে উপেক্ষা করে ওই কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে তোড়জোড় শুরু করেছে।
সূত্রমতে, ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ বিটিআরসি চেয়ারম্যানকে দেওয়া এক চিঠিতে এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতামতসহ জবাব দিতে বলে। এই চিঠির প্রায় দুই মাস পর ওই বছরের ১৪ ডিসেম্বর শ্বেতপত্র প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দ্বিতীয় চিঠিতে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুনরায় অনুরোধ জানায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.) দুটি চিঠির কোনোটিই আমলে নেননি। এর আগে গতবছরের ৩০ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ২০২১ ও ২০২৪ সালে গঠিত তিনটি কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই ২৯ জনসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে সাইনিং পাওয়ার রহিতের নির্দেশ দিয়েছিল। তবে কমিশন তাদের সুবিধামত ছয়জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ওএসডি করে শাস্তি কার্যকর করলেও এই ২৯ জনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, বরং তাদের বিদেশ ভ্রমণ ও আর্থিক প্রণোদনাসহ নানা সুবিধা দিয়েছে বলে রয়েছে একাধিক অভিযোগ।
এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সারোয়ার হোসাইনকে সোমবার (১৫ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ফোন করা হলে তিনি বিটিআরসিতে সরাসরি যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তিনি নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘এই বক্তব্যটা আসলে আমার দেওয়ার কথা না। আপনি আমাদের পিএস মহোদ্বয়ের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। মন্ত্রীর দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তার এটা দায়িত্ব নয়। আপনি বিটিআরসিতে যোগাযোগ করুন।’
এর আগে শনিবার (১৩ জুন) সন্ধ্যায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরীকে ফোন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি জানান, এই বিষয়টি নিয়ে তিনি কাজ করেন না। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করছেন না।
মন্ত্রণালয়ের আপত্তির পর নিজস্ব আইনি ফার্মের পরামর্শ
বিটিআরসি সূত্রমতে, তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান ও মহাপরিচালকের (প্রশাসন) সম্মিলিত আপত্তির মুখে চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিটিআরসির ৩০৪তম কমিশন সভায় চার কর্মকর্তার পদোন্নতি ‘নিয়োগ সম্পর্কিত অডিট আপত্তির সংশ্লিষ্টতা নিরূপণ সাপেক্ষে’ স্থগিত রাখা হয় এবং ‘বিশেষজ্ঞ মতামত’ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে এই ‘বিশেষজ্ঞ মতামত’ কোন পদ্ধতিতে কার কাছ থেকে নেওয়া হবে তা ডিপিসি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত না নিয়ে অত্যন্ত কৌশলে বহিঃসদস্যদের পাশ কাটিয়ে কমিশন সভায় সিদ্ধান্ত হয়।
কিন্তু সেই মতামত কার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে সেটিই প্রশাসনিক প্রহসনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক বিরোধে যথাযথ মতামত প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ হওয়ার কথা ছিল ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অথবা অডিট অধিদপ্তরের। কিন্তু কমিশন এই পথ সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কমিশন সচেতনভাবেই জানত এই তিনটি প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের মতামত ওই চার কর্মকর্তার পদোন্নতির বিপক্ষে যাবে, কারণ বিধিবিধানের আলোকে তা অনিবার্য। তাই গত ২৭ এপ্রিলের ৩০৬তম কমিশন সভায় কমিশন তার নিজস্ব কোর্ট রিটেইনার দুটি আইনি ফার্ম জাস্টিসিয়ার্স এবং ক্যাপিটাল ল চেম্বারের কাছ থেকে সংগৃহীত মতামত পেশ করে। এই দুটি ফার্ম কমিশনের পক্ষেই আদালতে মামলা পরিচালনা করে এবং কমিশনের দ্বারাই নিযুক্ত। তবে আদালত এই বিষয়ে রুল জারি করার পর, এ ধরনের মতামত কোনো ল চেম্বার প্রদান করতে পারে কিনা সে বিষয়ে বিটিআরসির লিগ্যাল বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যেই প্রশ্ন ওঠে।
এই দুটি ফার্মের মতামতের মূল বক্তব্য—অডিট আপত্তিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত; ব্যক্তিগত অসদাচরণের নয়। কোনো সক্ষম প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ বাতিল না করায় তা বৈধ থাকে; ২০২২ সালের প্রবিধানমালার অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে পদোন্নতি দেওয়া যেতে পারে; এবং নিয়োগ সংক্রান্ত এই অডিট আপত্তি পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো ‘আইনি প্রতিবন্ধকতা’ নয়।
উল্লেখ্য, একই বিষয়ে মতামত দিতে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া (অতিরিক্ত সচিব, অব.) মতামত দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন বলে সভার কার্যবিবরণীতেই উল্লেখ আছে, যা কমিশনের নিজের উদ্যোগের দুর্বলতার ইঙ্গিত।
এসব বিষয়ে শনিবার (১৩ জুন) সন্ধ্যা ৬টার দিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মোঃ আব্দুল বারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিটিআরসি একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। বিটিআরসিতে সবকিছু নিয়ম-কানুন অনুযায়ী করতে হবে। বিটিআরসিতে আপনি বললেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে অনেকগুলো নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল কোনো প্রকার পরীক্ষা ছাড়াই। এটা আমাকে চেক করে দেখতে হবে। এটার রেগুলেটরি বডি দেখা লাগবে।’ এ সময় তিনি বিটিআরসির সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করারও পরামর্শ দেন।
হাইকোর্টের রুলের জবাব নেই
বিটিআরসিতে কর্মরত ছয় উপপরিচালক—সঞ্জিব কুমার সিংহ, কাজী মো. আহসানুল হাবীব মিথুন, মো. জাকির হোসেন খান, এসএম আফজাল রেজা, মো. আসিফ ওয়াহিদ এবং মো. হাসিবুল কবির মন্ত্রণালয়ের চিঠির আলোকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এসএফআই তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের পদোন্নতি না দেওয়ার দাবি জানিয়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ পাঠান। সাড়া না পেয়ে তারা হাইকোর্টে রিট পিটিশন (নং ২০৪০/২০২৬) দায়ের করেন।
ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খানের শুনানি গ্রহণ শেষে বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ৫ মার্চ রুল জারি করেন। রুলে তিনটি বিষয়ে জবাব চাওয়া হয়েছে—মন্ত্রণালয়ের চিঠির আলোকে ব্যবস্থা না নেওয়া কেন অবৈধ হবে না; কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ হবে না এবং ৩ নভেম্বরে গঠিত ডিপিসির কার্যক্রম কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। দুই সপ্তাহের মধ্যে বিটিআরসি চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক (প্রশাসন), ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব এবং অডিট উইংয়ের যুগ্মসচিবকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত জবাব দাখিল করেননি কেউ।
রিটকারীদের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, ‘সরকারের তিনটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা ডিপিসিতে স্পষ্ট আপত্তি জানিয়েছেন। হাইকোর্টের রুল বিচারাধীন। এই দুটি বাস্তবতা উপেক্ষা করে পদোন্নতি কার্যকর করা হলে তা হবে একই সঙ্গে প্রশাসনিক নিয়মের লঙ্ঘন এবং আদালত অবমাননা। সেক্ষেত্রে আমরা যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেব।’
সাধারণ কর্মকর্তাদের ক্ষোভ
বিটিআরসির বর্তমান চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে এই পদোন্নতি প্রক্রিয়া নিয়ে কমিশনের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। তারা মনে করেন, এটি সরাসরি সুশাসন ও স্বচ্ছতা নীতির পরিপন্থী এবং দুর্বল নেতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ।
কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩০৬তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রশাসন বিভাগকে ‘বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম’ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশের আড়ালে মূলত অফিস আদেশের মাধ্যমে ওই চার কর্মকর্তাকে পরিচালক পদে পদোন্নতির প্রস্তুতি চলছে। অফিস আদেশে পদোন্নতি কার্যকর হলে তা পরবর্তী সময়ে বাতিল করা জটিল হয়ে পড়ে এবং বেতন-ভাতার দাবিতে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কমিশন সচিব মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইনকে সোমবার (১৫ জুন) বিকেল পৌনে ৪টার দিকে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। পরে এসএমএস করে বিকেল ৪টার পর আবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের মহাপরিচালক মোঃ মেহেদী-উল-সহিদকে সোমবার (১৫ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ফোন করা করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। পরে এসএমএসের পর বিকেল সোয়া ৪টার দিকে আবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।