অনিয়ম অনিঃশেষ–৭
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্যাশ কাউন্টার এবং ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ার (ওসেক) কাউন্টারে কর্মরত ৬ কর্মচারীর বিরুদ্ধে রোগীদের কাটা টিকেটের টাকা হাসপাতালের রাজস্ব কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ ওঠেছে। এ ঘটনায় ৫ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে ওই ৬ কর্মচারীকে সরিয়ে অন্যত্র দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের রাজস্ব আয়ের প্রায় ৪৮ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছে সূত্র। তবে সূত্রটি বলছে, কাগজে কলমে প্রায় ৪৮ লাখ টাকার হিসাব থাকলেও মূল অর্থ কোটি টাকার ওপরে।
সূত্রমতে, রোগীদের চিকিৎসক দেখানোর টিকিটের টাকা ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফির টাকা হাসপাতালের কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন এসব কর্মচারী। এ বিষয়ে ওই ছয় কর্মচারীকে সেসব টাকা হাসপাতালের কোষাগারে জমা দেওয়ার জন্য হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দিন স্বাক্ষরিত একাধিক চিঠিও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব অর্থ আদৌ ফেরত দেওয়া হয়েছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র বলছে, ওই ছয় কর্মচারী হলেন—অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. আবু সাইদ, মো. শফিউল ইসলাম, মো. মোজাম্মেল হোসেন খন্দকার, মেডিকেল রেকর্ড কিপার অনিক বড়ুয়া, টেলিফোন অপারেটর মোছা. সেলিনা আক্তার ও মো. মনিরুজ্জামান। তাদের ছয়জনকেই ওয়ান স্টপ ক্যাশ কাউন্টার এবং ওসেক কাউন্টার থেকে সরিয়ে অন্যত্র দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে তারা যে অপরাধ করেছেন, তাতে তাদের চাকরিচ্যুত করার কথা থাকলেও ওই হাসপাতালের পরিচালক মোহাম্মদ সেহাব উদ্দিন কোন কারণে তাদের গুরুদণ্ডের পরিবর্তে লঘুদণ্ড দিয়েছেন তা নিয়েই উঠেছে আরেক বড় প্রশ্ন।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, হাসপাতালটির ওয়ান স্টপ ক্যাশ কাউন্টার এবং ওসেক কাউন্টারে কর্মরত কর্মচারীদের রিফান্ড খাতে আর্থিক অনিয়মের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তদন্তে ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এ এফ রাব্বিকে সভাপতি এবং সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. নবির হোসেন, প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. শামীম আরা কেয়া, অর্থোপেডিক্স বিভাগের সহকারী রেজিস্টার ডা. আব্দুল্লাহ আল রাফি ও অ্যাকাউন্টস অফিসার কাজী মুরাদ হোসেনকে সদস্য করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব বাতিল করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাদের অন্যত্র দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। আবার পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট ওই কমিটি থেকে কাউকে বাদ নিয়ে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা। ওই কমিটির সভাপতি রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এ এফ রাব্বি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে অধ্যাপক ডা. এ এফ রাব্বিকে ৪ জুন, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ফোন করা হলে তিনি নাগরিক প্রতিদিনকে জানান, রোগী দেখছেন এবং পরে ফোন করতে বলেন। পরে আবার বিকেল পৌনে ৫টার দিকে তাকে ফোন করা হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, উল্লেখিত ওই ছয় কর্মচারীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কিছু টাকা ফেরত দিয়েছেন। তবে সব টাকা এখনো ফেরত পাওয়া যায়নি। সব টাকা ফেরত পেলে পরবর্তী সময়ে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এ ঘটনায় চলতি বছরের ১০ মার্চ অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মোজাম্মেল হোসেন খন্দকারকে হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দিন স্বাক্ষরিত একটি চিঠি প্রদান করা হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, আপনি অত্র হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্যাশ কাউন্টারে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে ১ লাখ ৫৮ হাজার ২১৫ টাকা সরকারি খাতে জমা না দিয়ে অবৈধভাবে নিজের কাছে রেখেছেন, যা সরকারি কর্মচারী বিধিমালার পরিপন্থি এবং প্রচলিত অর্থ আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। ইতোপূর্বে আপনাকে লিখিত ও মৌখিকভাবে বার বার বলা সত্ত্বেও উল্লেখিত টাকা জমা প্রদান করেন নাই। লিখিত ও মৌখিকভাবে বলা সত্ত্বেও কেন আপনার নিকট অবৈধভাবে সরকারি আদায়কৃত অর্থ জমা রেখেছেন তার উপযুক্ত জবাবসহ পত্র প্রাপ্তির দশ কর্মদিবসের মধ্যে উল্লেখিত অর্থ সরকারি কোষাগারে চালানের মাধ্যমে অথবা হাসপাতালের ক্যাশিয়ারের নিকট জমা দিয়ে অথবা নিম্নস্বাক্ষরকারী বরাবর প্রদান করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো। ব্যর্থতায় আপনার বিরুদ্ধে প্রচলিত সরকারি আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বাকিদেরও একই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. আবু সাইদকে বলা হয়েছে, আপনি হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্যাশ কাউন্টারে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে ১৭ লাখ ১৫ হাজার ৫৯০ টাকা সরকারি খাতে জমা না দিয়ে অবৈধভাবে নিজের কাছে রেখেছেন। অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. শফিউল ইসলামকে বলা হয়েছে, তিনি একই শাখায় দায়িত্ব পালনকালে ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮৪ টাকা সরকারি খাতে জমা না করে অবৈধভাবে নিজের কাছে রেখেছেন। টেলিফোন অপারেটর মোছা. সেলিনা আক্তারকে বলা হয়েছে, তিনি দায়িত্ব পালনকালে ১২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৫ টাকা সরকারি খাতে জমা না দিয়ে অবৈধভাবে নিজের কাছে রেখেছেন। এছাড়া টেলিফোন অপারেটর মো. মনিরুজ্জামান সরকারকেও একই নির্দেশনা দিয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, তিনি হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্যাশ কাউন্টারে দায়িত্ব পালনকালে ১১ লাখ ৪০ হাজার ৫৪০ টাকা সরকারি খাতে জমা না দিয়ে অবৈধভাবে নিজের কাছে রেখেছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হোসপাতালের রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হাসপাতালটির রাজস্ব আয় হয়েছে ১১.৫১ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০.৫০ কোটি টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব আয় ৫.৫০ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের পরিসংখ্যান সাফল্যের ইঙ্গিতই বহন করে। এই সাফল্যের মূলমন্ত্র ছিল সিস্টেম লস কমিয়ে আনা, রোগীদের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অতিরিক্ত দুটি ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং সরকারি কেনাকাটায় ই-জিপি সিস্টেম। তবে হাসপাতালের রাজস্ব আয় হয় মূলত রোগীদের টিকিট কেটে চিকিৎসক দেখানো, বিভিন্ন ধরনের চেকআপ বা টেস্ট করানোর ফি এবং হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে রোগী ভর্তি ও তাদের চিকিৎসাধীন থাকার ফি বাবদ আদায় করা অর্থ থেকে। কিন্তু হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারীদের কারণে এই রাজস্ব আয় ক্ষতির মুখে পড়ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালটির পরিচালক ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দিনকে বদলি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। সেখানে নতুন পরিচালক হিসেবে যোগদান করেছেন মামুনুর রশীদ।
তবে মোবাইলফোনে ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি থাকাকালীন চারজন টাকা ফেরত দিয়েছিলেন। বাকি দুজন মনে হয় এখনো টাকা ফেরত দিতে পারেননি। সব টাকা ফেরত পেলে আইন শাখার মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা চাওয়া হত।’
এসব বিষয়ে জানতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক মামুনুর রশীদকে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ফোন করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা না বলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) গ্রুপিং নিয়ে বলতে শুরু করেন এবং প্রতিবেদককে কোনো কথা বলার সুযোগ দেননি। তিনি বলেন, ‘ড্যাবের অপর গ্রুপটি মব সৃষ্টি করছে। সচিব মহোদয় আমাকে বলেছেন ফোর্স নিয়ে হাসপাতালে ঢুকতে। এটা চিকিৎসক ও আমাদের ইন্টারনাল বিষয়, এসব নিয়ে আপনাদের সাংবাদিকদের কিছু করার দরকার নেই।’ এসব বলেই ফোন কেটে দেন তিনি।
পরে আবার তাকে ফোন করে অন্য বিষয়ে আলাপের কথা বলা হলেও তিনি শুনতে চাননি। ‘অন্য কোনো বিষয় নয়। বিষয় এটাই’—বলেই আবারও তিনি ফোন কেটে দেন।
গত বুধবার (৩ জুন) নিজ কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে তোপের মুখে পড়েন ডা. মামুনুর রশীদ। পতিত ফ্যাসিস্টের দোসর আখ্যা দিয়ে তাকে তার কার্যালয় ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে কড়া নিরাপত্তায় তিনি হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন।