রাজধানীর মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস দীর্ঘদিন ধরেই ঘুষ, দালালি, দলিল বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, এই অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট, যারা শুধু ঘুষ ও দুর্নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িত। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে থানায় মামলাও রয়েছে।
সম্প্রতি পাওয়া নথি, মামলার এজাহার, ভিডিও ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কার্যত একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দলিল পাশ করানো থেকে শুরু করে নকল উত্তোলন, ফাইল নড়াচড়া কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ, সবকিছুর পেছনেই রয়েছে ঘুষ ও অবৈধ লেনদেনের একটি সংগঠিত ব্যবস্থা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৩ মার্চ তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী নাসরিন আক্তার। মামলায় গিয়াস উদ্দিন, বাদল মিয়া, মো. বাবু ওরফে ভুচকি বাবু, মো. শাহীন আলম, মো. আকিব হোসেন, আওলাদ হোসেন ও দলিল লেখক মো. কাশেমসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এদের মধ্যে আওলাদ হোসেন ও আকিব হোসেন মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল বাণিজ্য ও দালাল চক্রের অন্যতম নিয়ন্ত্রক।
সূত্র বলছে, সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদিরের নেতৃত্বে অফিসটিতে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্য চলছে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়া মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করছেন সহকারী সাব-রেজিস্ট্রার হারিস, আওলাদ হোসেন, আকিব হোসেন, মো. এনামুল, মো. মোস্তফা, মো. ইমরান, মো. ইউসুফ এবং দুদকের হাতে ঘুষ নেওয়ার সময় গ্রেপ্তার হওয়া ষাট টাকার উমেদার সোবহানের শ্যালক রাজীব। সূত্র জানায়, সোবহান বর্তমানে জামিনে থাকলেও অফিসে নিয়মিত উপস্থিত হন না।
মামলার বাদী নাসরিন আক্তার জানান, তার স্বামী মাহবুব গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নকল নবিশ হিসেবে কর্মরত। নকল নবিশ অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের প্রভাবশালী একটি চক্র তাদের পরিবারকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করতে শুরু করে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার স্বামীর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে কাজ করতে না দেওয়া, ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি একপর্যায়ে অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে।
মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মাহবুবকে মারধর করা হয় এবং পুরো ঘটনাটি সিসিটিভিতে ধারণ রয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ। ২০২৩ সালের ১০ জুলাই একটি ভুয়া দলিল যাচাই-বাছাই ছাড়াই মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রেজিস্ট্রি করা হয়। দলিল নম্বর ৫১৩৬ সংক্রান্ত ওই ঘটনায় এক ভুক্তভোগী সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদিরকে উকিল নোটিশও পাঠিয়েছেন।
গত ২৯ এপ্রিল ‘যে অফিসের ৬০ টাকার উমেদারও এখন কোটিপতি!’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর নাগরিক প্রতিদিনের হাতে আসে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ভিডিও ফুটেজ। এর মধ্যে ২৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, অফিসের ভেতরে বসেই ঘুষের টাকা গুনছেন নকল নবিশ আওলাদ হোসেন। আরেকটি ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ডের ভিডিওতে সাব-রেজিস্ট্রারের এজলাসে একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতি দেখা যায়। যদিও নিয়ম অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রারের এজলাসে একজন সহকারী ছাড়া অন্য কারও প্রবেশের সুযোগ নেই। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেখানে নিয়মিত প্রবেশ করেন দালাল ও বহিরাগতরা।
সূত্রমতে, বর্তমানে অফিসটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে চার সদস্যের একটি মূল সিন্ডিকেট। এরা হলেন—নকল নবিশ সমিতির কথিত নেতা আওলাদ হোসেন, তার ভাই ও পদবিহীন কথিত অফিস স্টাফ আকিব হোসেন, সহকারী সাব-রেজিস্ট্রার হারিস এবং সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদির। তাদের নেতৃত্বেই অফিসে সক্রিয় রয়েছে একাধিক দলিল লেখক, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ক্যাডার এবং দালাল চক্র।
জানা গেছে, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের ছত্রছায়ায় এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। বিনিময়ে দুর্নীতির অর্থের একটি অংশ নিয়মিত বিভিন্ন মহলে পৌঁছে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে অফিসটিতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের হেনস্তা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা সংঘবদ্ধভাবে ঘিরে ধরার মতো ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার।
সূত্র দাবি করছে, আওলাদ হোসেন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। তার ছোট ভাই আকিব হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কোনো বৈধ নিয়োগপত্র ছাড়াই বছরের পর বছর নিজেকে উমেদার পরিচয় দিয়ে অফিসে প্রভাব বিস্তার করছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রোববার বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে আওলাদ হোসেনকে ফোন করা হলেও তার নম্বরে সংযোগ পাওয়া যায়নি। পরে এসএমএস পাঠিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সহকারী সাব-রেজিস্ট্রার হারিসের কাছে ভিডিওতে ঘুষের টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি অফিসে এসে আওলাদকে জিজ্ঞেস করুন, কীসের টাকা নিচ্ছে?’ মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো দলিল পাশ হয় না, এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি অফিসে এসে স্যারের সঙ্গে কথা বলুন।’ এরপর তিনি ফোন কেটে দেন এবং পরে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদিরকে একাধিকবার ফোন ও এসএমএস করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এখন কার্যত একটি প্রভাবশালী দুর্নীতির সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। যেখানে সরকারি সেবা পাওয়ার চেয়ে দালাল ও প্রভাবশালীদের সঙ্গে সমন্বয় করাই যেন হয়ে উঠেছে প্রধান বাস্তবতা। অভিযোগ উঠেছে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি সেবা প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে ঘুষ, ভয়ভীতি এবং অবৈধ অর্থ বাণিজ্যের অভয়ারণ্যে।