ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমোর আকস্মিক আত্মহনন কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং এটি একটি বিভাগের ভেতরকার গুমোট হওয়া পরিস্থিতির বিষবাষ্পকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। মিমোর চলে যাওয়ার পর থেকেই বিভাগের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, ক্ষমতার দাপট আর শিক্ষার্থী নিপীড়নের পুরোনো ক্ষতগুলো নতুন করে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার বদলে বিশেষ পছন্দের শিক্ষার্থীদের সুবিধা দেওয়ার যে সংস্কৃতি, তা নিয়ে এখন তোলপাড় পুরো ক্যাম্পাস।
বিভাগের শিক্ষার্থীদের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সহকারী অধ্যাপক তানভীর নাহিদ খান। ২০২২ সালের এক প্রশ্নফাঁস বিতর্কের জের ধরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি একজন নির্দিষ্ট নারী শিক্ষার্থীকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে একাডেমিক ফলাফলে প্রথম সারিতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। শুধু তা-ই নয়, অভিযোগের তীর আরও গভীরে, বিভাগের যোগ্যতম ও প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া শিক্ষার্থীদের টপকে ওই নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীকে সর্বশেষ শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সুপারিশ করার চেষ্টার মতো গুরুতর অনিয়মের কথাও শোনা যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা দাবি করছেন, এই পৈশাচিকতার বীজ বপন করা হয়েছিল প্রায় এক যুগ আগে। ২০১৪ সালে ছাত্রীকে যৌন হয়রানির দায়ে স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত হওয়া অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলামের ছায়া যেন আজও বিভাগকে তাড়া করে ফিরছে। যদিও সাইফুল ইসলাম আদালতের রায়ে সম্প্রতি বিভাগে যোগদানের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শিক্ষার্থীদের তীব্র বাধার মুখে তা থমকে যায়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে তার নাম না থাকলেও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সেই পুরোনো সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়ে গেছে বলে মনে করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
এদিকে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থী নাসরিন সুলতানা অণুকে ঘিরে বিভাগে এক ধরনের ওপেন সিক্রেট আলোচনার ঝড় চলত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, শিক্ষক তানভীর নাহিদ খানের সঙ্গে অণুর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা সহপাঠীদের চোখে ছিল দৃষ্টিকটু। ২০২২ সালের শেষ দিকে এক মিডটার্ম পরীক্ষায় এই সম্পর্কের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে বলে দাবি করা হয়।
তৎকালীন ঘটনার অন্যতম সাক্ষী এবং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী অনিকা (ছদ্মনাম), যিনি বর্তমানে বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ক্যারিয়ারের শুরুতে ক্ষতির আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, তানভীর নাহিদ খান ও অণুর সম্পর্কের বিষয়টি তাদের ব্যাচে সবার জানা ছিল। অনিকা নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘অণু সবার সঙ্গে মিশত না, তার বন্ধু-বান্ধব ছিল না বললেই চলে। কিন্তু প্রায়ই তাকে নাহিদ স্যারের সঙ্গে হলের হাউস টিউটরের কক্ষে বা বাইরে দেখা যেত।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পর বিভাগের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, যাতে বিষয়টি আর না বাড়ানো হয়। অনিকার ভাষ্যমতে, বিভাগে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয় এবং শুরু থেকেই নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষার্থীকে শিক্ষক বানানোর জন্য ‘টার্গেট’ করে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেখানে বাকি মেধাবীরা উপেক্ষিত থেকে যান।
একই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও বর্তমানে গণমাধ্যমকর্মী ওবায়দুর রহমান সোহান সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে জানান, পরীক্ষার কক্ষ থেকে সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর একটি পরিত্যক্ত খাতা পাওয়া যায়। খাতাটি ছিল অণুর। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে থাকা উত্তরগুলো সেখানে হুবহু আগে থেকেই লেখা ছিল। প্রশ্ন পাওয়ার আগে কীভাবে উত্তর লেখা সম্ভব—এমন প্রশ্ন তুলে শিক্ষার্থীরা তখন বিদ্রোহ করেন। সোহানের দাবি, শিক্ষকরা শুরুতে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে চাইলেও প্রমাণের চাপে তানভীর নাহিদ খানকে কিছুদিনের জন্য একাডেমিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে রাখা হয় এবং অণুকে ওই কোর্সে শূন্য দেওয়া হয়। তবে অদ্ভুতভাবে পরে দেখা যায়, চূড়ান্ত ফলাফলে অণু শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থী নাসরিন সুলতানা অণু অবশ্য এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ঈর্ষাপ্রসূত বলে দাবি করেছেন। নাগরিক প্রতিদিনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমি গোল্ড মেডেল পেয়েছি কেবল ভালো ফলের জন্য নয়, বরং আমার মেধার গুণে। কেউ যদি ব্যক্তিগত স্বার্থে বা হিংসা থেকে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে, তবে তা মানহানিকর।’
এ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগে সুপারিশের বিষয়ে অণু অবগত নন বলে জানালেও এটি তার জন্য বড় অর্জন হতো বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও যোগ করেন, একজন নারী শিক্ষার্থী ভালো করলে সমাজ ও সহপাঠীরা প্রায়ই তার চরিত্র নিয়ে কথা তুলে তার মেধাকে খাটো করার চেষ্টা করে।
অন্যদিকে বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান কাজী তামান্না হক সিগমা স্বীকার করেছেন, ২০২২ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁসের একটি অভিযোগ এসেছিল এবং প্রাথমিক সত্যতার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ছাত্রীকে মিডটার্মে শূন্য দেওয়া হয়েছিল। এমনকি অভিযুক্ত শিক্ষক তানভীর নাহিদ খানকেও দীর্ঘদিন পরীক্ষার দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এত বড় অভিযোগের পরেও সেই শিক্ষক কীভাবে নিয়োগ বোর্ডে প্রভাব খাটানোর সুযোগ পান?
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ার বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। মুনিরা মাহজাবিন মিমোর মৃত্যুর ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। তবে ২০১৪ সালের বহিষ্কৃত শিক্ষকের ঘটনার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে তিনি এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলেননি।
পুরো ঘটনায় বক্তব্য জানতে সহকারী অধ্যাপক তানভীর নাহিদ খানকে একাধিকবার ফোন ও মেসেজ দেওয়া হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। তার এই নীরবতা শিক্ষার্থীদের মনে সন্দেহের দানা আরও মজবুত করছে। থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করেন, শিল্পকলার পাঠ যেখানে মেধা আর সৃজনশীলতার হওয়ার কথা, সেখানে যদি ব্যক্তিস্বার্থ আর অনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়, তবে মিমোদের মতো আরও অনেক মেধাকে অকালেই ঝরে পড়তে হবে।
বিভাগের ভেতরকার এই বৈষম্য, ভয় আর নিপীড়নের সংস্কৃতি বন্ধ না হলে উচ্চশিক্ষার এই পাদপীঠ অচিরেই তার গৌরব হারাবে। এখন দেখার বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্তের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটের শিকড় উপড়ে ফেলতে পারে কিনা, নাকি আরও একটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার অপেক্ষায় নীরব দর্শক হয়ে থাকবে।