রাজধানীর উত্তরার খোদ প্রাণকেন্দ্রে বসে যেন ‘সনদ জালিয়াতির’ এক ডিজিটাল হাট খুলেছিলেন একেএম আবু রায়হান। তার প্রতিষ্ঠানের নামের মধ্যে আছে ‘প্রফেশনাল’ শব্দটি। পর্দার আড়ালে জালিয়াতিতেও তিনি ছিলেন সমান ‘প্রফেশনাল’। পঞ্চম শ্রেণি পাস সাধারণ এক গাড়িচালককে রাতারাতি ‘বিলেত ফেরত গ্র্যাজুয়েট’ বানিয়ে দেওয়া কিংবা লাখ টাকার বিনিময়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া অনার্স সনদ হাতে ধরিয়ে দেওয়া—সবই ছিল তার ইশারায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে এই ভয়ংকর জালিয়াতির আখড়া ও আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের মাস্টারমাইন্ড আবু রায়হান এখন পুলিশের খাঁচায়। নাগরিক প্রতিদিনের বিশেষ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে উত্তরার বিএনএস সেন্টারের ১১ তলায় গড়ে তোলা সেই অন্ধকার জালিয়াতির পাহাড় ও কোটি কোটি টাকার প্রতারণার রোমহর্ষক সব তথ্য।
রাজধানীর উত্তরা এলাকার আজমপুরের বিএনএস সেন্টারের ১১ তলায় অবস্থিত প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড ফ্যাশন টেকনোলজি। এই প্রতিষ্ঠানেরই কর্ণধার একেএম আবু রায়হান। রায়হানের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম, জালিয়াতি, মানবপাচার, ভুয়া প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার, জাল সনদ প্রদান, ভুয়া সনদ বিক্রিসহ প্রতারণার অভিযোগ উঠছিল আগে থেকেই। এরইমধ্যে গত ১৩ মার্চ শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে বিএনএস সেন্টারের সামনে থেকে রায়হানকে গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তারের পরই এসব বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, একেএম আবু রায়হান বাংলাদেশ থেকে মানবপাচারের উদ্দেশ্যে ব্যক্তিদের ভুয়া ডকুমেন্ট তৈরি করে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর চেষ্টা করেন এবং পাঠান। সম্প্রতি নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে তার প্রতিষ্ঠানের ভুয়া পরিচয় দেখিয়ে জাল অভিজ্ঞতা সনদ, চাকরির কাগজ, ব্যাংক পেপার, কোম্পানির ফরওয়ার্ডিং লেটার ইত্যাদি প্রস্তুত করে বিদেশে পাঠিয়েছেন। মূলত নজরুল ইসলাম একজন পঞ্চম শ্রেণি পাশ ড্রাইভার। নজরুল ইসলামের পাসপোর্টের কপি নাগরিক প্রতিদিনের প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। নজরুল ইসলাম বর্তমানে যুক্তরাজ্য থেকে ফ্রান্সে পাড়ি জমিয়েছেন বলেও জানিয়েছে সূত্র।
অভিযুক্ত একেএম আবু রায়হান প্যাসিফিক ফাইবার লিমিটেড, প্যাসিফিক ফাইবার করপোরেশন লিমিটেড, প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড ফ্যাশন টেকনোলজি, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, সাপ্তাহিক পত্রিকা বৃত্তের বাইরেসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (ডিরেক্টর) বা কর্মকর্তা পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
সূত্র বলছে, এসব জালিয়াতি, প্রতারণা, মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই তিনি অবৈধ উপায়ে বিপুল অর্থ ও সম্পদের মালিক হয়েছেন। এসব কর্মকাণ্ডে শুধু তিনি একাই যুক্ত নন, রয়েছে একাধিক সহযোগী। সম্প্রতি তার এক সহযোগী তার বিরুদ্ধে চার কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের একটি মামলা করেন। মামলার ধারা ৪৫৪, ৪৫৭, ৩৮০ (প্যানাল কোড-১৮৬০)। ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন একেএম আবু রায়হান। এই মামলায় তার স্ত্রীকেও আসামি করা হয়েছে। আবু রায়হানের এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকে। আরেক মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় লেখাপড়া করে। তার ছোট ছেলে পড়াশোনা করে একটি ইংলিশ মিডিয়াম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে, যার মাসিক খরচ ৫ লাখ টাকা।
সূত্রমতে, একেএম আবু রায়হানের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর থানার হারেনজা গ্রামে। তার পিতার নাম খন্দকার আব্দুল মান্নান। আবু রায়হান শুধু দেশীয় আইনবিরোধী কাজই করেননি, আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী কাজও করেছেন অহরহ। এসব বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরগুলোতে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে একাধিক অভিযোগও।
সূত্র জানায়, প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড ফ্যাশন টেকনোলজি (পিআইএসএফটি), যার কলেজ কোড–৬৫৯৪, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধীভুক্ত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেও এর অধীনে কোনো কোর্স পরিচালনা না করেই তিনি এই প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে টাকার বিনিময়ে জাল নথি ও সনদ প্রদান করেন। এসব সদনের মধ্যে ডিপ্লোমা সনদ, ট্রেনিং সনদ, অভিজ্ঞতা সনদসহ অনার্সের সনদও রয়েছে। যেসব সনদের সবগুলোই ভুয়া। পিআইএসএফটি’র আওতায় রায়হান কলা বিভাগের অনার্স সনদ বিক্রি করেছেন ১ লাখ টাকায়, বিজ্ঞান বিভাগের সনদ বিক্রি করছেন দেড় লাখ টাকায় এবং ডিপ্লোমার সনদ বিক্রি করেছেন প্রায় লাখ টাকায়।
এ ধরনের জাল নথিপত্রের মাধ্যমে রায়হান মানবপাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য হিসেবেও কাজ করছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলাও বিভিন্ন থানায় রুজু আছে বলেও জানিয়েছে সূত্র। এছাড়াও, ভুয়া প্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ড, লেটারহেড, সিল, ট্রেড লাইসেন্স সদৃশ নথি ব্যবহার করে লোকজনকে প্রতারণা করেন তিনি।
১৭ মার্চ, মঙ্গলবার উত্তরার বিএনএস সেন্টারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, লিফটের ১০ অর্থাৎ ১১ তলায় অবস্থিত প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড ফ্যাশন টেকনোলজি, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি, ইউসিসিসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান। তবে সবগুলো প্রতিষ্ঠানই বন্ধ। ওই তলায় কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সি খোলা পাওয়া যায়। মূলত, বিএনএস সেন্টারের পুরো ১১ তলা প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড ফ্যাশন টেকনোলজির নামে ভাড়া নিয়েছেন রায়হান। এই তলাটি ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন কক্ষ ভাড়া দিয়েছেন নানান প্রতিষ্ঠানকে। দেখা গেছে, ওই তলায় নেই বিদ্যুৎ সংযোগ।
ওই তলার একটি প্রতিষ্ঠান ডিবেক্স এয়ার ইন্টারন্যাশনাল। এর মালিক মো. হুমায়ুন কবির সালমান। তিনি দাবি করেন, তার প্রতিষ্ঠনটি ৮ তলায় ছিল। কিন্তু রায়হান যখন পুরো তলা ভাড়া নিলেন, তখন তার কাছ থেকে দুটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। কিন্তু সময়মতো বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় ওই তলার বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন তিনি। তাই বাধ্য হয়ে অফিস ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র অফিস নিয়েছেন।
আবু রায়হানের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক আবু সাঈদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি গ্রেপ্তারের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ছুটিতে আছেন। এ মুহূর্তে কিছু বলতে পারছেন না।
একেএম আবু রায়হানের গ্রেপ্তারের বিষয়ে কথা বলতে নাগরিক প্রতিদিনের প্রতিবেদক দেখা করেন উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মো. রফিক আহমেদের সঙ্গে। তিনি নাগরিক প্রতিদিনকে জানান, নিয়মিত মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন একেএম আবু রায়হান।
গ্রেপ্তার হয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকার কারণে এসব বিষয়ে জানতে একেএম আবু রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।