দীর্ঘ নির্বাসন এবং রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষের দেশ বাংলাদেশে দুই বছরের অন্তর্বর্তীকালীন শাসন শেষে প্রধানমন্ত্রী হলেন তারেক রহমান। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় তার দল বিএনপি। এরপরই তারা নতুন সরকার গঠনের ঘোষণা দেয়।
নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে। অন্যদিকে তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট পায় ৭৭টি আসন।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচনের আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন, দল জিতলে তারেক রহমানই হবেন প্রধানমন্ত্রী। সে অনুযায়ী পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করল।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
১৯৬৭ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা তারেক রহমানের রক্তেই রয়েছে রাজনীতি। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়া এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বড় ছেলে। ১৯৮১ সালে যখন তার বাবা সেনাসদস্যদের হাতে নিহত হন, তারেক তখন কিশোর।
ঢাকার কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের কৌশলগত সমন্বয়ক জাকারিয়া পলাশ তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তারেক রহমান বেশ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং মা-বাবার কাছ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার পাঠ নিয়েছেন। এই উত্তরাধিকার তার জন্য বড় সম্পদ।
তিনি বলেন, তারেক রহমান তার মা বা বাবার উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবেন কি না-তা সময়ই বলবে। তবে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদের পথ অনুসরণ করা তার জন্য ‘অনিবার্য’। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে তার মূল চ্যালেঞ্জ।
জাকারিয়া পলাশ সতর্ক করে বলেন, সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা যেমন শাসনের জন্য ভালো, তেমনি এটি হাসিনাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার মতো ‘স্বৈরাচারী’ হয়ে ওঠার ঝুঁকিও তৈরি করে। তাই তারেক রহমানকে এখন বিরোধী মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
মালয়েশিয়ার টুঙ্কু আব্দুল রহমান ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং জামায়াতের নীতি নির্ধারণী দলের প্রতিনিধি সুমাইয়া রাবেয়া বলেন, মায়ের কাছ থেকে পাওয়া এই উত্তরাধিকার মোটেও সহজ নয়। বেগম জিয়া ত্যাগ, সহনশীলতা ও স্বৈরাচারবিরোধী অনড় অবস্থানের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক উচ্চতা তৈরি করেছিলেন।
লন্ডনে দুই দশকের নির্বাসন
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ কেটেছে লন্ডনে। প্রায় দুই দশক নির্বাসনে থেকেও তিনি প্রবাস থেকে দলের প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।
দুর্নীতিসহ একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০০৮ সালে জামিনে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য সপরিবারে লন্ডন যান তারেক রহমান। এর আগে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নিলে মার্চে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ ১৮ মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি লন্ডনের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। দল ও পরিবারের অভিযোগ, হেফাজতে থাকাকালে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে ফিরে আসেন, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার ভূমিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল। পাঁচ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মা খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির হাল ধরেন তারেক রহমান।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যমুক্ত’ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছিল বিএনপি। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় তারা।
নির্বাচনে জয়ের পর প্রথম ভাষণে তারেক রহমান ঐক্যের ডাক দিয়ে বলেন, ‘আমরা এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিচ্ছি, যখন একটি ফ্যাসিস্ট শাসনের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু করতে হচ্ছে। তবে জনগণের শক্তি সঙ্গে থাকলে কোনো বাধাই আমাদের থামাতে পারবে না।’