ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচারকে প্রথম ও প্রধান প্রতিশ্রুতি হিসেবে সামনে রেখে আট দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক ও ১১ দলীয় ঐক্য জোটের প্রার্থী নাসীর উদ্দীন পাটওয়ারী। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুর সাড়ে ৩টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি তার ইশতেহার উপস্থাপন করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আসন ঢাকা-০৮ (রমনা–পল্টন–মতিঝিল আংশিক) এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসা নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী জানান, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে তিনি সংসদে জোরালো ভূমিকা রাখবেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাপ প্রয়োগ অব্যাহত থাকবে। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটিই তার প্রধান অগ্রাধিকার হবে বলেও ঘোষণা দেন নাসীরউদ্দিন পাটওয়ারী।
‘পাটওয়ারীর অঙ্গীকার, ঢাকা-০৮ হবে জনতার, তোমার-আমার সুরক্ষার’ শিরোনামে ঘোষিত এই ইশতেহারে ঢাকা-০৮ কে চাঁদাবাজি, মাদক, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বমুক্ত নিরাপদ আসনে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
নাগরিকদের গোপনীয় অভিযোগ গ্রহণের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু, অপরাধপ্রবণ এলাকায় সিসিটিভি নজরদারি বৃদ্ধি, অন্ধকারাচ্ছন্ন রাস্তায় স্ট্রিট লাইট স্থাপন এবং নারী ও শিশুদের নিরাপত্তায় ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালুর কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়।
স্বাস্থ্যখাতে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে দালাল ও সিন্ডিকেটমুক্ত করে স্বাস্থ্যসেবাকে নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী। একই সঙ্গে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ভর্তি বাণিজ্য বন্ধ এবং আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও তিনি দেন।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির অংশ হিসেবে তরুণ ও শিক্ষিত বেকারদের জন্য উদ্যোক্তা সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ফান্ড এবং একটি আধুনিক স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার গঠনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি যানজট নিরসন, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি সংকট কমানো, হকার পুনর্বাসন, নিত্যপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং নাগরিক সেবা সহজ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ক্ষমতাকে এলিট ও জমিদার গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে সাধারণ মানুষের হাতে ফিরিয়ে আনাই তার রাজনীতির লক্ষ্য। তিনি নিজেকে জনতার এমপি হিসেবে দাবি করে বলেন, ‘নির্বাচিত হলে জনগণের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখতে হটলাইন ও ওয়ার্ডভিত্তিক ওয়ান-স্টপ সেবা কেন্দ্র চালু করা হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে বিবিএ ও এমবিএ ডিগ্রিধারী নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা আলিয়া মাদরাসা থেকে কামিলসহ কওমী শিক্ষাক্রমেও অধ্যয়ন করেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কোটাবিরোধী আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ বিভিন্ন ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পর বর্তমানে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন।
ঢাকা-০৮: কেন এই আসন গুরুত্বপূর্ণ
ঢাকা-০৮ আসনটি প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত। সচিবালয়, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর, বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও আন্দোলনের ঐতিহাসিক স্পটগুলো এই আসনের অন্তর্ভুক্ত। ফলে এখানে প্রার্থী বাছাইয়ে ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতা তুলনামূলক বেশি।
এই বাস্তবতায় নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারীর ‘জনতার এমপি, জনতার সেবক’ ধারণা ও ক্ষমতাকে এলিট গোষ্ঠীর হাত থেকে সাধারণ মানুষের কাতারে ফিরিয়ে আনার বক্তব্য ভোটারদের একটি অংশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা ও তরুণ ভোটব্যাংক
পল্টন, মতিঝিল ও রমনাকেন্দ্রিক এলাকায় তরুণদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, ইস্যুভিত্তিক আলোচনা ও সামাজিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাকে তরুণ ভোটারদের কাছে পরিচিত করেছে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তার ভূমিকা নতুন ভোটারদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, রাজপথের আন্দোলন থেকে সংসদ রাজনীতিতে প্রবেশের চেষ্টা, স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান, আলোচিত বিচার ইস্যু ও নাগরিককেন্দ্রিক ইশতেহার, সব মিলিয়ে নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা-০৮ আসনে কেবল একজন প্রার্থী নন, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তার প্রতিনিধিত্বকারী চরিত্র হিসেবে আলোচিত হচ্ছেন।