২০২৪ সালের ৮ আগস্ট, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দায়িত্ব নেওয়ার সময় তার ঘোষিত তিন অগ্রাধিকার—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। ১৮ মাস পর প্রশ্ন উঠেছে—এই সময়কালে বাংলাদেশ কী পেল? সাফল্য, বিতর্ক? নাকি অসমাপ্ত এক পরিবর্তনের অধ্যায়?
দায়িত্ব নিয়েই সরকার গঠন করে ১১টি সংস্কার কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ড. ইউনূস গড়ে তোলেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। অন্তত ৩০টি বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার দাবি করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আরপিও সংশোধনসহ নির্বাচনী ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তনও আনা হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে সরকার কৃতিত্ব নিতে পারে। তবে তার অভিযোগ—সংস্কার প্রক্রিয়ায় ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ এবং অ্যাডহকিজম ছিল, অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাত বাদ গেছে। অন্যদিকে সরকারের দাবি, সব সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব না হলেও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
এদিকে বিচার প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে আলোচিত রায় আসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে, যেখানে ক্ষমতাচ্যূত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি গুম ও হত্যা মামলায় তদন্ত ও বিচার শুরুর দাবি করে এই সরকার। কিন্তু সমালোচকদের মতে, ঢালাও মামলা, সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং গ্রেপ্তার নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। ‘বিচার নাকি প্রতিশোধ’—এই বিতর্ক এড়াতে সরকার আরও সতর্ক হতে পারত বলেও মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক চাপের মুখে সরকার প্রথমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বললেও, পরবর্তীতে আলোচনা শেষে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজন করে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংস্কার প্রশ্নে অনুষ্ঠিত হয় গণভোট। অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলছেন, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের বড় সাফল্য হলো—নির্বাচনের দিকে এগোতে পারা।
সরকারের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার, যা ১৮ মাসে বেড়ে ২৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে। এমনকি দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি রয়েই গেছে, যা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশ, আর ২০২৫ সালের গড় ছিল ৮.৭৭ শতাংশ। আবার চালের দামও কমেনি। ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আগের তুলনায় কঠিনতর হচ্ছে ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল আইনশৃঙ্খলা ও মব সহিংসতা। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা, মাজার ভাঙচুর, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ—এসব ঘটনায় সরকারের ভূমিকা প্রশ্নে জর্জরিত। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, অজ্ঞাতনামা লাশ, হেফাজতে মৃত্যু ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা বেড়েছে। তবে এই সরকারের বক্তব্য, অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ চ্যালেঞ্জিং, তবুও পরিস্থিতি যে আরও খারাপ হতে দেওয়া হয়নি তা নিয়েও তাদের সন্তুষ্টি স্পষ্ট।
নির্বাচনের আগে ও ক্ষমতার ঠিক শেষ মুহূর্তে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সই করে সরকার। তারা দাবি করে, শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে এবং আড়াই হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার মিলেছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, বড় চুক্তিগুলোর স্বচ্ছতা ও সময় নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ।
১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু কাঠামোগত সংস্কার, হাইপ্রোফাইল বিচার ও একটি জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করেছে, যা তাদের সমর্থকদের মতে বড় অর্জন। কিন্তু সামাজিক অস্থিরতা, মব সহিংসতা, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি ও বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। যদিও ড. ইউনূস তার বিদায়ী ভাষণে বলেছেন, ‘আমাদের প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি ছিল না।’
বাংলাদেশের জন্য ড. ইউনূস একটি স্থিতিশীল ভিত্তি রেখে গেলেন, নাকি অমীমাংসিত বিতর্কের এক দীর্ঘ ছায়া? সেই চূড়ান্ত রায় না হয় পরবর্তী ইতিহাসের হাতেই ছেড়ে যাচ্ছি।
লেখক: সাংবাদিক ও আবৃত্তিকার