আইন হলো রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। এর ওপর নির্ভর করেই মানুষ তার নিরাপত্তা ও ন্যায্যতা নিয়ে আশ্বস্ত থাকে। কিন্তু যখন মানুষ বুঝতে শুরু করে—আইন আছে, কিন্তু এর প্রয়োগ নেই; ন্যায়বিচার থাকলেও তা কেবল কাগজে-কলমে, তখন ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে আচরণ। এই পরিবর্তনটা অবশ্য একদিনে হয় না, ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে সমাজের ভেতরে।
আইনের ওপর যখন আস্থা কমে যায়, তখন ‘ভয়’ হয়ে যায় মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া। সেজন্য মানুষ রাষ্ট্রের ওপর আর নির্ভর করতে চায় না, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় নিজেই। ফলে অপরাধ দেখলেও মানুষ এগিয়ে আসে না, ঝামেলায় জড়াতে চায় না, ঝামেলা বাড়বে মনে করে অন্যের বিপদ দেখলেও পাশ কাটিয়ে যায়।
একে বলা যেতে পারে আত্মরক্ষার মানসিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মানুষ ভাবে—আজ সাহায্য করলে, কাল নিজেই বিপদে পড়তে পারি, তখন কি কেউ এগিয়ে আসবে?
এছাড়া, আইনের ওপর বিশ্বাস দুর্বল হলে মানুষ আদালত বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারস্থ না হয়ে বিকল্প পথ খুঁজে নেয়। তখন—অন্যায় মেনে নিয়ে সমঝোতায় যেতে চায়, প্রভাবশালী বা শক্তিশালী ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের কাছে মাথানত করে। অর্থাৎ মানুষ ভাবতে থাকে, “যার ‘শক্তি’ বেশি, সেই সর্বেসর্বা। আইনের শাসন যেহেতু নেই, তাদের কাছ থেকে বাঁচার উপায়ও নেই।”
ফলে সমাজে ন্যায়বিচারের স্থান পূরণ হয় ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাবের মাধ্যমে। এতে নিজেকে ‘দুর্বল’ ভাবা মানুষ আরও ‘দুর্বল’ হয়ে পড়ে।
আইনের প্রতি আস্থা কমে গেলে নাগরিক দায়িত্ববোধও নীরবে কমে যেতে থাকে। মানুষ তখন নিজেকে রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে মনে না করে একজন বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হিসেবে ধারণা করে। ফলে, নিয়ম মানতে চায় না, ছোটখাটো আইন ভাঙাকে স্বাভাবিক হিসেবে মনে করে এবং ‘সবাই করছে, আমি করলে সমস্যা কী’ এই যুক্তিতে গা ভাসিয়ে দেয়। ফলে আইন ভাঙাই নিয়মে পরিণত হয়, যেহেতু আইনের শাসনও পাকাপোক্ত থাকে না।
আইনের প্রতি অনাস্থা মানুষকে ধীরে ধীরে নীরব করে তোলে। মানুষ কথা বলতে, প্রতিবাদ করতে ভয় পায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে ‘দর্শক’ হয়ে যায়। এই নীরবতাই সমাজের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ, অপরাধ তখন শুধু অপরাধীর দ্বারা সংঘটিত কোনো কাজ থাকে না, হয়ে ওঠে পুরো সমাজের উপেক্ষার ফল।
আইনের ওপর আস্থা হারানো মানুষ মানসিকভাবেও হয়ে পড়ে ক্লান্ত। সারাক্ষণ তাকে সতর্ক থাকতে হয়, কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না, নিজের বিপদ নিজেকেই সামলানোর ঝামেলা মানসিক চাপ তৈরি করে।
তবে শুধু আইন কঠোর করলেই যে আস্থা ফিরবে, তা কিন্তু নয়, দরকার—আইনের নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান প্রয়োগ, দ্রুত ও ন্যায়বিচার, সাধারণ মানুষের জন্য সহজে বিচার পাওয়ার সুযোগ, অপরাধীর শাস্তি এবং নিরপরাধ মানুষের সুরক্ষা—দুটিরই নিশ্চয়তা।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মানুষকে বিশ্বাস করানো, আইন তার পক্ষে আছে, বিপক্ষে নয়।