কবি গোলাম মোস্তফা তার কিশোর কবিতায় লিখেছিলেন—‘আমরা নূতন, আমরা কুঁড়ি, নিখিল বন-নন্দনে / ওষ্ঠে রাঙা হাসির রেখা, জীবন জাগে স্পন্দনে। / লক্ষ আশা অন্তরে / ঘুমিয়ে আছে মন্তরে / ঘুমিয়ে আছে বুকের ভাষা, পাঁপড়ি-পাতার বন্ধনে। / সাগর-জলে পাল তুলে দে’ কেউ বা হবো নিরুদ্দেশ, / কলম্বাসের মতই বা কেউ পৌঁছে যাবো নূতন দেশ। / জাগবে সাড়া বিশ্বময় / এই বাঙালি নিঃস্ব নয়, / জ্ঞান-গরিমা শক্তি সাহস আজও- এদের হয়নি শেষ।’ আমাদের ছোটবেলায় এই কবিতাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাংলা বইতে আমরা পড়েছিলাম। কবি কিশোরদের অনুপ্রেরণা দিয়ে কবিতাটি লিখেছিলেন। সেই কবিতাটি পড়ে সেই কিশোররা এখন অনেক বড় হয়েছেন, যেমনটি কবিতায় ছিল। কেউ কেউ দেশ শাসন করছেন। দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যুক্ত হয়েছেন অনেকেই। কিন্তু আধুনিক আলোতে সমুজ্জ্বল গণতান্ত্রিক যুগেও কবিতার সেই কিশোররা এখনো দেশ পরিচালনা করছেন সামন্তযুগের মন দিয়ে।
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে গণতন্ত্রের কাঠামো তৈরি হয়েছে বটে, কিন্তু সেই কাঠামোতে এখনো প্রাণের সঞ্চার হয়নি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের খামখেয়ালি কর্তৃত্ববাদী মনের উত্তাপে গণতন্ত্রের কাঠামোগুলো দাঁড়িয়ে আছে বজ্রাঘাতে মরে যাওয়া তালগাছের মতোই। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে যখন সামন্তযুগের সমাপ্তি ঘটে, তখন ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি এদেশে নতুনভাবে সামন্তশ্রেণি সৃষ্টি করে ১৭৯৩ সনে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস কর্তৃক চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে। নিজেদের প্রভুত্ব স্থায়ী করার লক্ষ্যে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি’ অনুসরণ করে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল পাকিস্তানি শাসকদের অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী, ক্ষমতাশ্রয়ী, ঔপনিবেশিক নীতি ও কার্যক্রম। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল চিহ্নিত সামন্তশ্রেণিকে দেশ থেকে বিতাড়ন করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে এখন বাংলাদেশ স্বাধীন বটে; কিন্তু মন ও মননে সামন্তযুগেই রয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে চলমান সময়ে শিশুদের প্রতি নৃশংসতা বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ইউনিসেফ। শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা দিনদিন বেড়েই চলেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। এছাড়াও বিভিন্ন ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ১১৫ শিশু খুন হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতে ৮ বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সারাদেশে যখন তোলপাড় চলছে, এমনই প্রেক্ষাপটে শিশুদের প্রতি নৃশংসতা বন্ধের পদক্ষেপ নিতে জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন ইউনিসেফ।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) ১৫ জুলাই তাদের অর্ধ-বার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছেন, গত ৬ মাসে (জানুয়ারি-জুন) সারাদেশে শিশু-কিশোরসহ ৪০৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে ২৩৮ জনই শিশু ও কিশোরী। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৭ জন। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৮৮ জন নারী ও শিশু। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু। গতবছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪২ জন। চলতি বছরে এই হার বেড়েছে ৫৬ শতাংশ।
এইচআরএসএস তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, গত ৬ মাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে ৮৮ জন নারী ও শিশুকে। সেই সঙ্গে এই সময়ে ৪৭৬ জন নারী ও শিশুকে যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে। যৌতুকের দাবিতে ৬ মাসে ১৯ জন নারী নিহত হওয়ার পাশাপাশি ৮ জন আহত হয়েছেন এবং তিনজন আত্মহত্যা করেছেন। গত ৬ মাসে পারিবারিক সহিংসতায় ৩২০ জন নারী নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি এই সময়ে পারিবারিক সহিংসতায় ২১১ জন নারী আহত এবং আত্মহত্যা করেছেন ১৪৭ জন নারী। এছাড়াও আরও ৪ জন নারী এসিড সহিংসতায় আহত হয়েছেন। এইচআরএসএস-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত ৬ মাসে দেশে ১ হাজার ৭৭ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩০৫ শিশু মারা গেছে। এছাড়াও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে আরও ৭৭২ শিশু। গতবছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৬৭৩। এদের মধ্যে ১৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এইচআরএসএস-এর তথ্যমতে গত ছয়মাসে শিশুসহ নারী ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের শিকার সবমিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ২৫ জন।
উল্লেখ্য, ২০২০-২০২৪ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে এইচআরএসএস তথ্যে আমরা দেখি, বাংলাদেশে ওই সময়ে প্রায় ১১ হাজার ৭৫৮ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন ও নৃশংসতার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৬ হাজার ৩০৫ জনকে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ধর্ষিতাদের মধ্যে ৩ হাজার ৪৭১ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে, যা মোট ঘটনার ৫৫ শতাংশেরও বেশি। এর মধ্যে আবার ১ হাজার ৮৯ জন নারী ও কন্যাশিশুকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ২০৭ জনকে যৌন সহিংসতার পর হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই ১১৮। প্রায় ৫০ জন ভয়াবহ সহিংসতার ট্রমা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। উল্লেখ্য, ওই সময়ে যৌতুকের জন্য ৩৫৫ জনকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৬ জন আত্মহত্যা করেছেন। যৌতুক সম্পর্কিত সহিংসতায় ২৯০ জন নারীর মৃত্যু হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতায় ১ হাজার ২৬২ জন নারী নিহত, ৩৮৬ জন আহত এবং ৪১৬ জন আত্মহত্যা করেছেন। এসিড হামলায় ৯৪ জন নারী ও কন্যাশিশু আহত হয়েছে, যার মধ্যে ৯ জন ভয়াবহ হমলার ঘটনায় মারা গেছে।
২০২৫ সালের পরিস্থিতিও একই রকম। এই সময়ে ২২৪ জন নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ১০৭ জনকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৬৬ জন অপ্রাপ্ত বয়স্ক। ২৭ জন নারী ও শিশুকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ২৯ জন যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৬টিই শিশু। যৌতুক সম্পর্কিত সহিংসতায় মারা গেছে ৬ জন নারী এবং আহত দুজন। পারিবারিক সহিংসতায় ৫৮ নারী প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে ২০ জন আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়াও এসিড হামলায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।
পরিসংখ্যানে ঊনিশ-বিশ হতে পারে, কিন্তু সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমগুলোতে আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাগুলো। ধর্ষণ হলো অন্যতম প্রধান মানবাধিকার লঙ্ঘণ, যার শিকার মূলত নারী ও শিশু। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো, পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিকতার অবক্ষয়, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নারীদের প্রতি বৈষম্য ও সম্মানহীনতার সংস্কৃতি, পারিবারিক ও সামাজিক আস্কারা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া, ক্ষেত্র বিশেষে সাধারণ জনগণ কর্তৃক অপরাধীদের সমর্থন করা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা এবং সমঝোতা ও উপযুক্ত জবাবদিহিতার অভাব অপরাধীদের ক্ষমতায়ন করছে।
ধর্ষণ ও ধর্ষণজনিত মৃত্যুর ঘটনা ছাড়াও পারিবারিক ভাঙন বা বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে কত শিশুর জীবন অনিশ্চিত তা সুনির্দিষ্ট করে বলা প্রায় অসম্ভব। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্যে জানা যায়, দেশে প্রতি এক হাজার জনের বিবাহ বিচ্ছেদের হার গড়ে ১.১ থেকে ১.৪ জন। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, একেকটি বিবাহ বিচ্ছেদের কেন্দ্রবিন্দুতে এক বা একাধিক শিশু চরম মানসিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশে বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীরা অনেক এগিয়ে। দেশের সিটি কর্পোরেশনগুলোর তথ্যমতে, মোট বিবাহ বিচ্ছেদের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের আবেদন নারীদের পক্ষ থেকে আসে। সমাজ বিজ্ঞানীরা এর মূল কারণ হিসেবে দেখছেন দেনমোহর ও খোরপোষ আদায়, কর্মসংস্থান-স্বাবলম্বী ও সচেতনতা, সহ্য ক্ষমতার বাইরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, সহজলভ্য স্মার্টফোন ও প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং পরকীয়া। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, পরকীয়ার ক্ষেত্রে পুরুষদের থেকে নারীরা এগিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড এর গবেষক ড. ডিলান সেলটারম্যান বলেছেন, ‘মানুষ শুধু সঙ্গীর প্রতি অসন্তুষ্ট বলেই নয়, কখনো কখনো নতুন অভিজ্ঞতার আকর্ষণ বা কৌতূহল থেকেও পরকীয়ায় জড়ায়।’ দাম্পত্য সম্পর্কের অসন্তুষ্টি, রোমাঞ্চ ও নতুনত্বের খোঁজ, মানসিক স্বস্তি ও মুক্তি, ডেটিং অ্যাপ অনলাইন ফ্ল্যাটফর্ম, কর্মস্থলের ঘনিষ্ঠতা, প্রেমে পড়ার স্বভাব, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, স্বার্থ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অল্প বয়সে বিয়ে, শৈশবের ট্রমা, প্রতিশোধ পরায়ণতা ও অভ্যাসগত প্রতারণাকে গবেষকরা পরকীয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পরকীয়া বা বিবাহ বিচ্ছেদ যাই হোক না কেন মূল ভুক্তভোগী কিন্তু শিশুরা। দেশে ৩৪ লাখেরও বেশি পথশিশু রয়েছে। চরম দারিদ্রতা, মা-বাবার বিবাহ বিচ্ছেদ, পারিবারিক কলহ ও পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যাওয়ায় কারণে এসব শিশু ঘর ছেড়ে অনিশ্চিত জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিবাহ বিচ্ছেদের পর সন্তানের অভিভাবকত্ব ও ভরণপোষণের দীর্ঘ আইনি জটিলতার কারণেও শিশুরা বড় ধরনের মানসিক ট্রমার মুখোমুখি হয়। ভেঙে যাওয়া পরিবারের শিশুরা তীব্র একাকিত্ব, অনিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যহীনতায় ভোগে। এছাড়াও বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় এক লাখের মতো শিশু স্বস্থ্যসেবা ও চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। খাদ্যের অভাব ও অপুষ্টিজনিত কারণেও প্রায় ৩ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হয়। এমতাবস্থায় শিশুদের নিরাপত্তা বিধানে রাষ্ট্রের প্রধান করণীয় বিষয়গুলো হলো—আইনের কঠিন প্রয়োগ, দেশের আনাচে কানাচে পর্যাপ্ত শিশু সহয়তা কেন্দ্র স্থাপন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, শিশুদের জন্য নিরাপদ খাদ্য ও পরিবেশ তৈরি এবং পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। দেশের সাধারণ জনগণের প্রশ্ন, স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে শিশুরা তো নিরাপদ থাকার কথা ছিল, স্বাধীন দেশে তো সমাজপ্রভু নেই, ঔপনিবেশিক শাসন শোষণ নেই, তবে কেন স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিশুদের প্রতি এই চরম নৃশংসতা?
একটি স্বাধীন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ, সরকারি আমলা-কামলা এবং রাজনীতিক ও সমাজসেবীদের সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থার মানসিকতা পরিহার করে শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে একযোগে কাজ করা উচিত, কেননা আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ। শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ মানেই উজ্জ্বল বাংলাদেশ।
লেখক
সামছুদ্দোহা সোহাগ
সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়