ইরানের ওপর চলতে থাকা ক্রমবর্ধমান ও অনির্দিষ্টকালীন হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন ইসরায়েলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। একই সঙ্গে তারা এমন কিছু সম্ভাব্য ‘এক্সিট র্যাম্প’ বা ‘প্রস্থান পথ’ বা সমাধানের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এমনটি হলে হয়তো যুদ্ধ আরও বিস্তার লাভ করার আগেই থেমে যেতে পারে এবং অঞ্চল ও বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এসব জানানো হয়েছে।
যুদ্ধের শেষ পরিণতি বা ‘এন্ডগেম’ নিয়ে আলোচনা এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে। হামলা থামানো হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপরই নির্ভর করছে। তিনি এখনো পূর্ণাঙ্গ বিজয়ের লক্ষ্যে এগোতে চাইছেন। তবে রোববার এক টেলিফোন আলাপে ইরান যুদ্ধের পরিকল্পনা ও কৌশলের সঙ্গে পরিচিত একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা ট্রাম্পের দাবি করা ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর বিকল্প কিছু সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। পরিস্থিতির সংবেদনশীলতার কারণে তিনি নিজের পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ জানান।
যুদ্ধের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে ট্রাম্প নিজেও কয়েকটি ভিন্ন ধারণার মধ্যে দোলাচলে ছিলেন। শুরুতে তিনি ইরানি শাসনব্যবস্থার কিছু নমনীয় সদস্যের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি আত্মসমর্পণের দাবি তোলেন। কারণ হিসেবে বলেন, যাদের সঙ্গে তিনি আলোচনায় বসতে চেয়েছিলেন, তারা ইতিমধ্যে নিহত হয়েছেন। ট্রাম্পের মতোই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও বলেছেন, তিনি লড়াই চালিয়ে যেতে চান, যে মুহূর্তকে তিনি শনিবার ‘সত্যের মুহূর্ত’ বলে বর্ণনা করেন।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর আলোচনার প্রতি এই অবজ্ঞা আরও বাড়তে পারে রোববারের এক ঘোষণার পর। সেখানে জানানো হয়, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হয়েছেন প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি। আলী খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি তার আবাসিক কম্পাউন্ডে চালানো এক বিমান হামলায় নিহত হন। নতুন এই নেতা কট্টরপন্থী। অনেকের মতে, তিনি তার বাবার চেয়েও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ। আলোচনার টেবিলে বসার মতো মানুষ তিনি নন।
গত কয়েক দিনে যেসব কর্মকর্তার সঙ্গে ওয়াশিংটন পোস্ট কথা বলেছে, তাদের এবং ওই ইসরায়েলি কর্মকর্তার উদ্বেগের মূল কারণ হলো—‘যুদ্ধের মূল্য ক্রমাগত বাড়ছে।’ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের সংকটে ঠেলে দিতে পারে। আর ট্রাম্প নিজেও রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। কারণ জনসমর্থন ছাড়াই তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে নিয়ে গেছেন।
ইসরায়েলি ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে পতন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আমাদের স্বার্থে কি না, আমি নিশ্চিত নই। কেউই অনন্তকাল ধরে চলা কোনো গল্প চায় না।’
তার মতে, ‘ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বোমা হামলা প্রায় সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যেখানে তাদের প্রধান সামরিক লক্ষ্যগুলো অর্জিত হতে পারে। জুনে যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণের পর ইরানের যে অবশিষ্ট পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল, তা ধ্বংসের কাছাকাছি। একই সঙ্গে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, অস্ত্র তৈরির কারখানা এবং সামরিক, গোয়েন্দা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বও লক্ষ্যবস্তুতে রয়েছে।’ তবে এই সামরিক লক্ষ্য পূরণে আর কত সময় লাগতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি।
তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমরা চাই শাসনব্যবস্থার পতন হোক। কিন্তু সেটাই একমাত্র শেষ লক্ষ্য নয়।’ বড় বড় সামরিক লক্ষ্য ধ্বংস হয়ে গেলেও ‘ইসরায়েল তার উদ্দেশ্য অর্জন করবে।’ তার ভাষায়, ‘ইরান আত্মসমর্পণ করবে না। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার বার্তা পাঠাতে পারে।’
তবে নেতানিয়াহু গত রোববার বলেন, যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে ইসরায়েল চায় ‘শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে।’ তবে ওই কর্মকর্তার মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এমন একটি মত রয়েছে যে তারা যুদ্ধের শেষ চাইছে। বিশেষ করে গাজায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো কৌশলগত শেষ লক্ষ্য নির্ধারণ না করায় অনেকেই নেতানিয়াহুর প্রতি হতাশ। তার কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়েও তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
ইসরায়েলি ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এই শাসনব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে কে আসবে, এমন কাউকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মধ্যেও একই ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে। তার মতে, ইরানের কেন্দ্রীভূত কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো দুর্বল হতে শুরু করেছে। ভেতরে কিছু বিভাজনের ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে। তবে তা থেকে এখনই শাসনব্যবস্থার দ্রুত পতনের কোনো লক্ষণ নেই।
তিনি আরও বলেন, কুর্দি বা অন্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার কৌশল ভালো হবে না। কারণ এতে ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো—নেতানিয়াহু যেন লেবাননে বড় ধরনের স্থল অভিযান শুরু না করেন, যার উদ্দেশ্য হবে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ মিলিশিয়াকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা আরেকটি যুদ্ধে টেনে নিয়ে এক পঙ্কিল জলাভূমিতে আটকে পড়তে চাই না।’ তিনি আরও বলেন, ‘লেবাননের পথে পা বাড়ালে সেটি একধরনের পিচ্ছিল ঢাল হতে পারে।’
ইসরায়েলি ওই কর্মকর্তার আরেকটি উদ্বেগ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। এমন এক সময়ে এই উদ্বেগ বাড়ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যেই ইসরায়েলের সঙ্গে জোট নিয়ে ক্রমবর্ধমান প্রশ্ন উঠছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো অনন্ত যুদ্ধে টেনে নিতে চাই না। ইসরায়েল একটি নির্ভরযোগ্য মিত্র’—যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বোঝা নয়।’
লেখক: পররাষ্ট্র বিষয়ক কলাম লেখক, ওয়াশিংটন পোস্ট