আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যানবাহনের চাহিদা বাড়লেও সাপ্তাহিক ও সরকার-ঘোষিত ছুটি মিলিয়ে চার দিনের ছুটি থাকা সত্ত্বেও কেন ব্যক্তিমালিকানাধীন ও বাণিজ্যিক গাড়ি ব্যাপকভাবে রিকুইজিশন করা হচ্ছে—এই প্রশ্ন ঘিরে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।
নির্বাচনের সময় ভোটের সরঞ্জাম পরিবহন, নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন ও প্রশাসনিক কাজে বিপুলসংখ্যক যানবাহন প্রয়োজন—এ কথা স্বীকার করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সমালোচকদের দাবি, এই সময়ে স্বাভাবিকভাবেই অনেক সরকারি গাড়ি অব্যবহৃত থাকার কথা। তবুও গণপরিবহণ থেকে শুরু করে নোয়াহ, হায়েস, পিকআপসহ বিভিন্ন গাড়ি রিকুইজিশন করা হচ্ছে, যা আইনি সীমা ও হাইকোর্টের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—সে প্রশ্নও উঠছে।
গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। তারা তাদের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে কিংবা বিভিন্ন গ্রুপে এ নিয়ে মতামত লিখছেন। ফেসবুক ঘাঁটলে গাড়ির রিকুইজিশন নিয়ে এরকম অহরহ পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই পূর্ব নোটিশ ছাড়া, নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ না করে এবং ক্ষতিপূরণ নিয়ে স্পষ্টতা ছাড়াই গাড়ি নেওয়া হচ্ছে। মালিকরা বলছেন, একদিকে গাড়ি বন্ধ থাকায় ব্যবসায়িক ক্ষতি, অন্যদিকে চালকদের থাকা-খাওয়ার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে চাপ বাড়ছে।
আইন অনুযায়ী, জনস্বার্থে সাময়িকভাবে গাড়ি রিকুইজিশনের সুযোগ থাকলেও হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—
• প্রাইভেটকার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ট্যাক্সি রিকুইজিশন করা যাবে না
• একটানা সাত দিনের বেশি রাখা যাবে না
• পূর্ব নোটিশ, নির্দিষ্ট সময়, ক্ষতিপূরণ ও জ্বালানি/খাবারের দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে
• ছয় মাসে একই গাড়ি দুইবার নেওয়া যাবে না
• যে কোনো গাড়ির রিকুইজিশন অবশ্যই জনস্বার্থে করতে হবে।
• রিকুইজিশন করা গাড়ি কোনা কর্মকর্তা ব্যক্তিগত বা পরিবারের কাজে ব্যবহার করতে পারবেন না।
• কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন কোনো যানবাহন পূর্ব নোটিশ ছাড়াই রিকুইজিশন করা যাবে না।
• প্রত্যেক থানায় রিকুইজিশন করা গাড়ির তালিকা সংরক্ষণ করতে হবে।
• রিকুইজিশন করা গাড়ির কোনো ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। গাড়ির পেট্রোল খরচ বহন করতে হবে। চালকদের খাবার খরচও দিতে হবে।
• নারী, শিশু, রোগী বহনকারী গাড়ি রিকুইজিশন করা যাবে না।
• এসব নির্দেশনা পালনে পুলিশ কমিশনার কর্তৃক একটি সার্কুলার জারি করে তা সব পুলিশ কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হবে।
• রিকুইজিশন করা গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
তবে বাস্তবে এসব নির্দেশনা মানা হচ্ছে কি না—তা নিয়েই প্রশ্ন। পরিবহন মালিকদের সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এবার ভাড়া, স্টাফ বেতন ও জ্বালানি ব্যয়ের বিষয়ে কোনো পরিষ্কার গাইডলাইন দেওয়া হয়নি। ফলে শহরতলীর একটি গাড়ির সাত দিনে ক্ষতি দাঁড়াতে পারে উল্লেখযোগ্য অঙ্কে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকারি গাড়ির স্বল্পতা ও নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত চাহিদা পূরণ করতেই রিকুইজিশনের হার বেশি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ কাজ করবেন; বিভিন্ন বাহিনী ও প্রশাসনিক কাজে গাড়ি বণ্টন করতে হয়।
তবুও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—সরকারি ছুটি থাকা অবস্থায়ও কেন এই মাত্রার রিকুইজিশন? হাইকোর্টের নির্দেশনা মেনে বিকল্প ব্যবস্থাপনা বা সরকারি গাড়ির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যেত কি না—সে আলোচনাই এখন কেন্দ্রে।