অন্তর্বর্তী সরকার র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) নাম বদলে স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স (এসআইএফ) করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দ্রুততম সময়ে এই বিষয়ে সরকারি আদেশ জারি করা হবে। প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন আদেশ জারির পর নতুন নামে কার্যক্রম শুরু করবে এই এলিট ফোর্স।
সচিবালয়ে মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বিষয়টি জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, বাহিনীটির কাঠামো ও কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনার পর নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পোশাকও বানানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টা অনুমোদন দিয়েছেন। শিগগিরই একটি সরকারি আদেশ জারি হবে।
নাম পরিবর্তনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, নামটির প্রতি মানুষের খারাপ ধারণা ছিল, মানুষের ইচ্ছেই ছিল এই নামটির পরিবর্তন হোক। মানুষের ইচ্ছে পূরণ করতেই র্যাবের নামের পরিবর্তন হয়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকেই র্যাবের কার্যক্রমে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। র্যাবের নামের পরিবর্তনের সঙ্গে কাজেরও পরিবর্তন আসবে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের পর পুলিশের মনোবল অনেক ভালোভাবে ফিরে এসেছে। আগের পুলিশ এখন আর নেই। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন খুবই সুষ্ঠু, উৎসবমুখর, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হবে। নির্বাচনে মব হবে না বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সেভাবেই সব ধরনের চেষ্টা করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
২০০৪ সালের ২৬ মার্চ গঠিত হয় বিশেষ বাহিনী র্যাব এবং একই বছরের ১৪ এপ্রিল তারা কার্যক্রম শুরু করে। র্যাব গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে এ বাহিনীর নাম ছিল র্যাপিড অ্যাকশন টিম (র্যাট)। তবে পরবর্তীতে র্যাব নামে এই ফোর্সটি আত্মপ্রকাশ করে। ২২ বছর পর এবার এই নামটি বদলে ফেলা হচ্ছে। দ্য আর্মড পুলিশ অর্ডিন্যান্স ১৯৭৯ (সংশোধনী ২০০৪) অনুসারে বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সদস্যদের নিয়ে র্যাব গঠিত হয়। র্যাবের সদর দপ্তর ঢাকার উত্তরায় অবস্থিত।
অন্যদিকে র্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে র্যাব ও বাহিনীটির সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ও পররাষ্ট্র দপ্তর পৃথকভাবে এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদও ছিলেন। তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর যে তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশও রয়েছে। নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) দীর্ঘদিন ধরেই র্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়ে আসছে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং জনবান্ধব পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে র্যাবের অতীত কার্যক্রম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পর্যালোচনা করে বাহিনীটির প্রয়োজনীয়তা পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
র্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছে বিএনপিও। ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, র্যাবের অতীত কর্মকাণ্ড এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সংস্কারের সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানে যেমন গ্যাংগ্রিন হলে কেটে ফেলতে হয়, তেমনি এই বাহিনী বিলুপ্তি ছাড়া উপায় নেই।’