শিকারির ফাঁদ থেকে উদ্ধারকৃত সেই বাঘিনী টানা ছয় মাসেরও বেশি সময় চিকিৎসার পর রোববার (১৩ জুলাই) তার আবাসস্থল সুন্দরবনে ফিরে যাচ্ছে। সম্প্রতি বাঘটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করার বিষয়ে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম উপস্থিত থেকে রোববার বিকেলে বাঘিনীকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করবেন। সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বনাঞ্চলে বাঘটিকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ জানায়, রোববার সকালে বাঘিনীকে নিয়ে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক বনাঞ্চলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়া হয়েছে। বাঘটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করার জন্য অভিজ্ঞ ও প্রখ্যাত বন্যপ্রাণী চিকিৎসক, বাঘ বিশেষজ্ঞ এবং বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে চারটি দল গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া বাঘিনীর গতিবিধি দেখার জন্য সুন্দরবনে আট কিলোমিটার জুড়ে ২০টি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। গুরুতর আহত বাঘিনীটি এখন পুরোপুরি সুস্থ।
বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘গেল ছয় মাস সাফারি পার্কের অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধায়নে আমরা বাঘটির দেখভাল করেছি। বাঘটি এখন শতভাগ সুস্থ। গত শুক্রবার (১০ জুলাই) অভিজ্ঞ ও প্রখ্যাত বন্যপ্রাণী চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিক্যাল টিম সার্টিফিকেট দিয়েছে। এর প্রেক্ষিতে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক বনাঞ্চলে বাঘটিকে অবমুক্ত করা হবে।’
বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, ‘বাঘের জীবনকাল সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এই বাঘিনীর বয়স ১০ থেকে ১১ বছর। দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণীটি হারানো ক্ষিপ্রতা ও গতি ফিরে পেয়েছে। বর্তমানে এর ওজন প্রায় ৯০ কেজি।’
বনবিভাগ সূত্র জানায়, পূর্ব সুন্দরবনে শিকারির ফাঁদে আটক রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছয় মাসের চিকিৎসা শেষে ফিরে যাচ্ছে তার আবাসস্থল সুন্দরবনে। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি দুপুরে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খালের অদূরে শিকারিদের পেতে রাখা হরিণ ধরার ছিটকা ফাঁদে আটকে পড়ে একটি বয়স্ক বাঘিনী। গুরুতর আহত অবস্থায় বাঘিনীকে বন বিভাগের বিশেষজ্ঞ দল ৪ জানুয়ারি উদ্ধার করে। খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড বাঘিনীকে চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যা করেন।
বন অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি চিকিৎসক হাতেম সাজ্জাত জুলকারনাইন বলেন, ‘উদ্ধারকালে বাঘিনীটি ছিল নিস্তেজ, দুর্বল ও ক্ষীণকায়। সামনের বাম পায়ে, প্রায় তিন ইঞ্চি জায়গা জুড়ে চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফাঁদের রশিতে টানাটানির কারণে ক্ষতস্থানে পচন ধরেছিল। অ্যান্টিবায়োটিক ও নিয়মিত ড্রেসিংয়ের ফলে মার্চ মাসের দিকে ঘা শুকিয়ে আসে। বর্তমানে ক্ষতস্থান ভরাট হয়ে সেখানেও লোম গজিয়েছে।’
বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) ইমরান আহমেদ বলেন, ‘সুস্থ হয়ে বাঘিনীটি আগের চেহারায় ফিরেছে। নয় ফুট দৈর্ঘ্যের বাঘিনীর ওজন বেড়ে হয়েছে ৯০ কেজি। তার ক্ষিপ্রতা বেড়েছে। সে এখন শিকার ধরে খেতে পারবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বনে ছাড়ার পরে সুন্দরবনে বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য বাঘিনীটির গলায় একটি কলার পরানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় বিদেশ থেকে সেটি আনা সম্ভব হয়নি। এখন বনে ছাড়ার পরে তার গতিবিধি দেখার জন্য ক্যামেরা ট্র্যাপিং করা হবে। সে লক্ষ্যে আন্ধারমানিক বনাঞ্চলের আট কিলোমিটার জুড়ে ২০টি গোপন ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। ২০২৪ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে বাঘিনীটিকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তিনবার শনাক্ত করা হয়েছিল।
বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল জানান, বাঘটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করার জন্য অভিজ্ঞ ও প্রখ্যাত বন্যপ্রাণী চিকিৎসক, বাঘ বিশেষজ্ঞ এবং বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে চারটি দল গঠন করা হয়েছে। এগুলো হলো, বাঘের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মেডিক্যাল দল, বাঘের মানসিক ও আচরণগত সক্ষমতা পরীক্ষার জন্য বাঘ বিশেষজ্ঞ দল, বাঘটিকে ধরা, অবমুক্তকরণের স্থানে পরিবহন ও অবমুক্ত করার জন্য একটি বিশেষায়িত দল এবং বাঘের নিরাপত্তা ও বনের পার্শ্ববর্তী জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অবমুক্ত করার পর বাঘের গতিবিধি নজরদারির জন্য একটি পর্যবেক্ষণ দল গঠন করা হয়েছে। এরা অন্তত এক বছর ধরে বাঘ অবমুক্তকরণ এলাকার চারপাশে বাঘের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।