দেশে চলাচলকারী লাখ লাখ মোটরসাইকেল, উচ্চমূল্যের ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে নতুন করে করের আওতায় আনতে বড় ধরনের পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। সরকারের ভাষ্য, রাজস্ব আয় বাড়ানো, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং উচ্চমূল্যের যানবাহনের মালিকদের কর নেটের মধ্যে আনা, এই তিন লক্ষ্য সামনে রেখেই নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন হলে এর প্রভাব পড়বে শুধু ধনীদের ওপর নয়, বরং মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনেও, এমন আশঙ্কা ইতোমধ্যেই সামনে এসেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানাচ্ছে, গত ১১ মে আসন্ন বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এক বৈঠকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মোটরসাইকেলের ওপর নতুন অগ্রিম আয়কর আরোপ, উচ্চ সিসির বিলাসবহুল গাড়ির কর বাড়ানো এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রস্তাব তোলে। বৈঠকে বিষয়গুলো নিয়ে নীতিগত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে মোটরসাইকেল নিবন্ধনের সময় মালিকদের নির্ধারিত রোড ট্যাক্স দিতে হয়। দুই বছরের জন্য এই কর ২ হাজার ৩০০ টাকা এবং ১০ বছরের জন্য ১১ হাজার ৫০০ টাকা। এখন এই বিদ্যমান খরচের পাশাপাশি নতুন করে অগ্রিম আয়কর বা এআইটি বসানোর চিন্তা করছে এনবিআর। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল করমুক্ত থাকতে পারে। তবে ১১১ থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত বাইকের জন্য বছরে ২ হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত বাইকের জন্য ৫ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের জন্য বছরে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর ধার্যের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, এই কর সরাসরি রাজস্ব বাড়ানোর জন্য যতটা, তার চেয়ে বেশি করদাতাদের তথ্যভান্ডার শক্তিশালী করার জন্য। কারণ অনেকেই উচ্চমূল্যের বাইক ব্যবহার করলেও আয়কর নথিতে তাদের আর্থিক সক্ষমতার প্রতিফলন দেখা যায় না। অগ্রিম আয়কর পরিশোধ করলে পরে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সেই অর্থ সমন্বয় করার সুযোগ থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজারে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে মোটরসাইকেল ছিল তুলনামূলক কম আয়ের মানুষের পরিবহন, এখন সেখানে কয়েক লাখ টাকার প্রিমিয়াম বাইকের বাজারও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রয়্যাল এনফিল্ড, ইয়ামাহা আর ওয়ান ফাইভসহ উচ্চমূল্যের বাইক ঢাকার তরুণদের মধ্যে নতুন আকর্ষণ তৈরি করেছে। এসব বাইকের দাম সাড়ে তিন লাখ থেকে সাত লাখ টাকার বেশি পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে সরকারের একটি অংশ মনে করছে, এ ধরনের বিলাসী ব্যয়ের সঙ্গে কর কাঠামোর সংযোগ থাকা উচিত।
তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, সব মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীকে একইভাবে দেখাটা কতটা যৌক্তিক। কারণ দেশের বড় একটি অংশ মোটরসাইকেল ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করে। রাইড শেয়ারিং চালক, কুরিয়ার কর্মী, ওষুধ সরবরাহকারী, বিক্রয় প্রতিনিধি কিংবা ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য মোটরসাইকেল এখন আয়ের প্রধান মাধ্যম। অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারও স্কুল-কলেজে যাতায়াত, বাজার করা কিংবা জরুরি কাজে কম খরচের পরিবহন হিসেবে বাইকের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নতুন কর তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
এনবিআরের সাবেক সদস্য সৈয়দ মোহাম্মদ আমিনুল করিম মনে করেন, দামি মোটরসাইকেলের ওপর কর আরোপ যৌক্তিক হতে পারে। তার ভাষায়, কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে কমছে, ফলে রাজস্ব বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। তবে তিনি এটাও বলেছেন, সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত বাইকের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হলে সেটি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে।
এনবিআর এখন বিশেষভাবে নজর দিচ্ছে উচ্চ সিসির প্রাইভেট কারের দিকে। কর্মকর্তাদের মতে, ২ হাজার ৫০০ সিসি থেকে ৪ হাজার সিসি বা তার বেশি ক্ষমতার গাড়ির মালিকরা সাধারণত উচ্চ আয়ের মানুষ। তাই বিলাস পণ্যের খাত থেকে বেশি রাজস্ব আদায়ের সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে ইঞ্জিন ক্ষমতা অনুযায়ী বছরে ২৫ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত কর রয়েছে। এই হার আরও বাড়ানো হতে পারে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত এসইউভি বা স্পোর্টস ইউটিলিটি যানবাহনের সংখ্যা ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। এছাড়া এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৩ হাজার সিসির বেশি ক্ষমতার অন্তত ৫ হাজার ২৮৮টি বিলাসবহুল গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে দেশে। কর কর্মকর্তাদের ধারণা, এই খাতে এখনও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের সুযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত অংশটি হচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা। বর্তমানে এসব যানবাহনের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন না থাকলেও সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দেশে ৩০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে। শহর ও গ্রামে কর্মসংস্থান এবং স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে এই যান এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় এটি স্থানীয় অর্থনীতির প্রধান বাহনেও পরিণত হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় চলা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্য বছরে ৫ হাজার টাকা, পৌরসভা এলাকায় ২ হাজার টাকা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ১ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর ধার্যের চিন্তা করা হচ্ছে। এর আগে সরকার “বৈদ্যুতিক ত্রি-চক্রযান ব্যবস্থাপনা নীতিমালা”র খসড়াও তৈরি করেছিল, যেখানে নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ ও ট্যাক্স টোকেন বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়।
তবে বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, বাস্তবে এই খাতে কর আদায় সহজ হবে না। কারণ অধিকাংশ অটোরিকশাই অনিবন্ধিত এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত হয়। ফলে কর কাঠামো কার্যকর করতে হলে আগে নিবন্ধন, লাইসেন্সিং এবং তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। নইলে নতুন কর শুধু হয়রানির নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের অনেকে বলছেন, সরকার এখন কঠিন রাজস্ব সংকটের মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বিভিন্ন সংস্থা বারবার কর আদায় বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাজস্ব বাড়ানোর দায় শেষ পর্যন্ত কতটা সাধারণ মানুষের কাঁধে গিয়ে পড়বে। কারণ জ্বালানি, বিদ্যুৎ, খাদ্য ও পরিবহন ব্যয়ের চাপে আগে থেকেই চাপে রয়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো।