তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের সহায়তা চেয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার। এই পদক্ষেপ এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাবের মাঝে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বেইজিংয়ে বুধবার (৬ মে) বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিস্তা নদী নিয়ে আলোচনা হয় বলে বাসসের বরাত দিয়ে জানিয়েছে পিটিআই।
তিস্তা নদী পূর্ব হিমালয় থেকে উৎসারিত হয়ে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই নদী বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের জীবিকা ও কৃষিকাজে সেচের প্রধান উৎস।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ওয়াং ই বলেন, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় ঢাকার সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করতে প্রস্তুত চীন।
বাসসের তথ্যমতে, ওয়াং ই আরও জানান, বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে বিআরআই প্রকল্পে সহযোগিতার সমন্বয় ঘটাতে এবং অর্থনীতি, অবকাঠামো ও জনযোগাযোগের মতো প্রথাগত খাতগুলোতে সহযোগিতা আরও গভীর করতে প্রস্তুত চীন।
তিনি বলেন, চীন সরকার তার দেশের উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী ওয়াং ই জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ‘কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটি কোনো তৃতীয় পক্ষের প্রভাবিত হওয়াও উচিত নয়’।
গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের এটিই প্রথম চীন সফর। তিনি গত মঙ্গলবার বেইজিং পৌঁছান। আজ বৃহস্পতিবার তার সফর শেষ করার কথা রয়েছে।
এর কয়েক সপ্তাহ আগে খলিলুর রহমান ভারত সফর করেছিলেন, যা বেইজিং গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার চীন ও পাকিস্তানের কাছাকাছি যাওয়ায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়।
চীন দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা পুনরুদ্ধার প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। এই প্রকল্প ভারতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেনস নেকের কাছাকাছি অবস্থিত, যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে সংযুক্ত করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ভারত তিস্তা অববাহিকার জন্য প্রযুক্তিগত ও সংরক্ষণ সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিল।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে পানি বণ্টন বরাবরই সংবেদনশীল ইস্যু। ১৯৯৬ সালে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি বণ্টনের জন্য সই হওয়া ৩০ বছর মেয়াদী ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ যদি নবায়ন করা না হয়, তাহলে চলতি বছরেই তা শেষ হয়ে যাবে।
চীন দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশে তার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ বিতরণের মাধ্যমে জাপান, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পর চীন এখন বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহৎ ঋণদাতা দেশ।
বুধবারের আলোচনায় উভয় দেশই তাদের উন্নয়ন কৌশলের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করে ‘চীন-বাংলাদেশ ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব’ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।
এছাড়া তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের অবস্থানের প্রতি পুনরায় সমর্থন ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ।
বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা ‘এক চীন’ নীতির প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং তাইওয়ানকে ‘চীনের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করে ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’র বিরোধিতা করেছে।
অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের ‘জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা’ রক্ষায় তাদের সমর্থন এবং দেশটির জনগণের বেছে নেওয়া উন্নয়ন ধারার প্রতি পুনরায় সমর্থন জানিয়েছে।