সারাদেশের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলায় প্রথম পর্যায়ে ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখে টাঙ্গাইলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন।
রোববার (১২ এপ্রিল) সচিবালয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন পিআইডি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষি মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, কৃষি ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সচিব উপস্থিত ছিলেন।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষকের আর্থ-সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ, কৃষি খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সুস্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছেন। যার মূল লক্ষ্য হলো, আত্মনির্ভর জলবায়ু সহিষ্ণু প্রযুক্তি নির্ভর ও কৃষি কেন্দ্রিক একটি আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। যেখানে উৎপাদন ও বিপণন হবে তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক।’
তিনি বলেন, কৃষক হবে ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তা ও কৃষিকাজ জাতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি, এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি কৃষকের জন্য কৃষক কার্ড প্রদান কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কৃষক কার্ড প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত কৃষকদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা ও কৃষি খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা গঠন করা।’
মন্ত্রী জানান, কৃষি কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে জমির মালিকানা অনুযায়ী কৃষককে পাঁচটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে, ভূমিহীন কৃষক, প্রান্তিক কৃষক, ক্ষুদ্র কৃষক, মাঝারি কৃষক ও বড় কৃষক। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষককে কৃষক কার্ড প্রদান করা হবে। কার্ড বিতরণ কার্যক্রম তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে, প্রি-পাইলটিং, পাইলটিং ও দেশব্যাপী কার্যক্রম গ্রহণ।
পাইলটিং পর্যায়ে আটটি বিভাগের ১০টি জেলায় ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকের ফসল উৎপাদনকারী কৃষকের পাশাপাশি মৎস্য চাষী, মৎস্য আহরণকারী, প্রাণিসম্পদ খাতে নিয়োজিত খামারি ও দুগ্ধ খামারিসহ ভূমিহীন প্রান্তিক ক্ষুদ্র মাঝারি ও বড় শ্রেণীর কৃষককেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, প্রাক-পাইলট পর্যায়ে কৃষক কার্ড বিতরণের জন্য নির্বাচিত জেলা ও কৃষি ব্লকসমূহ হচ্ছে: পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলার কমলাপুর ব্লক, বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার উথলি ব্লক, ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলায় কৃপালপুর ব্লক, পিরোজপুর জেলায় নেসারাবাদ উপজেলায় রাজাবাড়ি ব্লক, কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলায় রাজারছড়া ব্লক, কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর উপজেলার অরণ্যপুর ব্লক, টাঙ্গাইল জেলার টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সুরুজ ব্লক, রাজবাড়ী জেলার গোয়ালনন্দ উপজেলায় তেনাপঁচা ব্লক, মৌলভীবাজার জেলায় জুড়ি উপজেলায় ফুলতলা ব্লক, পঞ্চগড় জেলার গোদা উপজেলার পাঁচপীর ব্লক ও জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার গাইবান্ধা ব্লক।
মন্ত্রী বলেন, ‘এই ১১টি ব্লকের কৃষক, মৎস্য চাষী প্রাণিসম্পদ খামারি ও লবণ চাষীগণকে কৃষক কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে।’
কৃষক কার্ড সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, ‘এটি একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় পর্যায়ের শাখাসমুহে সংশ্লিষ্ট কৃষকদের নামে এই কার্ডের বিপরীতে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘১১ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত মোট ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের সব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তার মধ্যে ভূমিহীন কৃষক ৪৬ জন, প্রান্তিক কৃষক নয় হাজার ৪৫৮ জন, ক্ষুদ্র কৃষক ৮৯৬ জন, মাঝারি কৃষক এক হাজার ৩০৩ জন ও বড় কৃষক ৫১ জন।’
মন্ত্রী জানান, বাছাইকৃত কৃষকগণের ধরণ: ফসল উৎপাদনকারী কৃষক দুই হাজার ১৪১ জন, মৎস্যজীবী ৬৬ জন, প্রাণিসম্পদ খামারি ৮৫ জন, লবণ চাষী তিন জন। মোট বাছাইয়ের ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের মধ্যে কেবল প্রণোদনার জন্য নির্বাচিত ভূমিহীন প্রান্তিক ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যা ২০ হাজার ৬৩১ জন যা মোট কৃষকের ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
মন্ত্রী বলেন, ‘পাইলটিং পর্যায়ে ভূমিহীন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকগণকে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি দুই হাজার ৫০০ টাকা হারে বার্ষিক নগদ সুবিধা প্রদান করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘উক্ত কার্ডের মাধ্যমে কৃষকগণ প্রণোদনা ও সেবা গ্রহণ করবে সংশ্লিষ্ট ডিলারের নিকট সরবরাহিকত্ব পিওএস প্রিন্ট সেল মেশিন ব্যবহার করে সার বীজ মৎস্য, প্রাণী ও খাদ্যসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ কিনতে পারবে।’
মন্ত্রী জানান, প্রাক পাইলটিং কার্যক্রমের জন্য ব্যয় হবে চার কোটি ৩৪ লাখ টাকা। প্রাক পাইলটিং সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর ২০২৬ পর্যন্ত দেশের ১৫টি উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। পাইলটের অভিজ্ঞতার আলোকে আগামী চার বছরে সারাদেশে এই কার্ড বিতরণ ও ডাটাবেজ তৈরির কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
মন্ত্রী আরও জানান, আগামী পহেলা বৈশাখ, নতুন বছরের প্রথম দিন পাক পাইলটিং পর্যায়ে কৃষক কার্ড বিতরণ উদ্বোধন হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টাঙ্গাইলের শহীদপুর মারুফ স্টেডিয়ামে এই কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করবেন। কুমিল্লা জেলা আদর্শ সদর উপজেলার অরুণ্যপুর ব্লক বাদে দেশের বাকি নয়টি ব্লকে একই দিনে কৃষক কার্ড বিতরণ করা হবে। কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর উপজেলার অরণ্যপুর ব্লকে ১৭ এপ্রিল ২০২৬ কৃষক কার্ড বিতরণ করা হবে।
তিনি জানান, কৃষি একটি সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা। এই কৃষক কার্ড কৃষকের মর্যাদাকে আরও মহিমান্বিত করবে। এই কার্ডের মাধ্যমে বিধিবদ্ধ সেবার বাইরেও সময় উপযোগী নতুন নতুন সেবা যুক্ত হবে।
তিনি বলেন, ‘কৃষি খাত দেশের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড বাংলাদেশের আগামীর ভবিষ্যৎ কৃষকের হাতে আমাদের কৃষি জমির উর্বরতা মাটির গুনাগুন ফসলের বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা হবে।’
মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বলেন, ‘এই কার্ডের মাধ্যমে দেশের কৃষি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত একটি স্মার্ট ডাটাবেজের আওতায় আসবে। সারের অপচয় রোধ ও চাহিদা মাফিক ফসল উৎপাদন, সর্বোপরি কৃষকের ক্ষতিপূরণ সরকারের নজরে আনতে এই কার্ড সহায়ক হবে।’