জাতীয় সংকট মোকাবেলায় সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে খোলামেলা আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে তিনি সংসদকে কার্যকর করে গণতান্ত্রিক ধারাকে শক্তিশালী করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে জামায়াতের দুই দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল ৩টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াত আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, আহত ও পঙ্গুত্ব বরণকারীদের জন্য দোয়া করে বলেন, ‘স্বাধীনতা একটি জাতির জন্য অমূল্য সম্পদ, যা পরাধীন জাতি বেশি গভীরভাবে উপলব্ধি করে।’
প্রায় ১৯০ বছর পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকার পর বাঙালি জাতি স্বাধীনতার মূল্য বুঝতে পেরেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলে জনগণকে বৈষম্যহীন সমাজ ও ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং বৈষম্য ও নির্যাতন বেড়েছে, যার ফলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। সে সময় গণরায়ের প্রতি অবজ্ঞা, দমন-পীড়ন, নির্বিচারে হত্যা, নারীর ইজ্জতহানি ও সম্পদ ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জামায়াত আমিত বলেন, তাদের আত্মত্যাগের কারণেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তবে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও দেশ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জন করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাপানের উদাহরণ তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দেশটি অল্প সময়েই উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বকে বিস্মিত করেছে। অথচ বাংলাদেশ দুইবার স্বাধীনতা অর্জনের পরও সে গতিতে এগোতে পারেনি। এর জন্য জনগণ নয়, বরং নেতৃত্বের ব্যর্থতা, লোভ, অদূরদর্শিতা ও দুর্নীতি দায়ী বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দুর্নীতির ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, শুধু অর্থ আত্মসাৎ নয়—মানুষের অধিকার হরণ, অযোগ্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো এবং যোগ্যদের অবমূল্যায়ন করাও দুর্নীতির অন্তর্ভুক্ত। এসব দুর্নীতি দূর না হলে স্বাধীনতার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, শাসক পরিবর্তন হলেও শোষণের ধারা পরিবর্তিত হয়নি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন ও জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পরিবর্তে প্রশাসক নিয়োগের সমালোচনা করে তিনি একে সংবিধানবিরোধী বলে উল্লেখ করেন।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, জাতীয় সংকট মোকাবেলায় সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে সংলাপে বসতে হবে এবং সংসদকে কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি সমস্যা ও শিল্পখাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। বিরোধীদল হিসেবে গঠনমূলক সমালোচনা ও সহযোগিতার আশ্বাসও দেন।
সংবিধান প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, এটি কোনো স্থির বিষয় নয়; সময়ের প্রয়োজনে সংস্কার করা যেতে পারে এবং অতীতেও তা হয়েছে।
শেষে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল সময় অতিক্রম করছে। এ সময় হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা জরুরি। জনগণের অধিকার রক্ষায় সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যেকোনো ফ্যাসিবাদী প্রবণতা রুখে দিতে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
বক্তব্যের শেষে জামায়াত আমির মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং দেশের শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।