পবিত্র ঈদুল ফিতরের দ্বিতীয় দিনেও রাজধানী ছাড়ছেন ঘরমুখো মানুষ। ঈদ উপলক্ষে গত ১৭ মার্চ থেকে টানা সাত দিনের ছুটি থাকায় এবার ঈদযাত্রা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ঈদ পরবর্তী যাত্রায় বাস সংকট ও ভাড়া নৈরাজ্যে এখনও ভোগান্তি হচ্ছে বলে মনে করছেন যাত্রীরা।
রোববার (২২ মার্চ) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গাবতলী বাস টার্মিনাল, মহাখালী বাস টার্মিনাল এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে—যাত্রীর চাপ থাকলেও তুলনামূলক বাসের সংখ্যা কম। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
যাত্রীরা জানান, অনেক রুটে বাসের সংকট থাকায় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বরিশাল ও সাতক্ষীরা রুটে এই সংকট প্রকট। সুযোগে কিছু পরিবহন বেশি ভাড়া আদায় করছে বলে অভিযোগ তাদের।
প্রতি বছরই ঈদের দ্বিতীয় দিনে রাজধানীতে ঈদ করা একাংশ মানুষ গ্রামে যান। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সকাল থেকেই বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনে ভিড় বাড়তে শুরু করে। তবে সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা গেছে বাস টার্মিনালগুলোতে।
আজ সায়েদাবাদে গোল্ডেন লাইন, শ্যামলী পরিবহন ও হানিফসহ বিভিন্ন কাউন্টারে উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। যাত্রীরা টিকিটের জন্য অপেক্ষা করলেও বাস কম থাকায় অনেকেই বিপাকে পড়েছেন।
সাতক্ষীরাগামী যাত্রী মুরাদ কায়েস জানান, অনেক দিন পরে মামার বাড়ি যাচ্ছেন। কিন্তু সরাসরি কোনো বাস না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন। অধিকাংশ বাস খুলনা পর্যন্ত যাচ্ছে, ফলে গন্তব্যে পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
গাবতলী টার্মিনালেও একই চিত্র। সকালেই অধিকাংশ টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ায় অনেক যাত্রী টিকিট পাননি। রংপুর, রাজশাহী, খুলনাসহ বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় টিকিট দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
শ্যামলী পরিবহনের কর্মকর্তা মো. রুবেল জানান, সকাল থেকেই যাত্রীর চাপ বেশি ছিল, ফলে লাইনে দাঁড় করিয়ে টিকিট দিতে হয়েছে।
সোহাগ পরিবহনের কাউন্টারের কর্মী আবু কায়েস বলেন, ২০ মিনিটের মধ্যেই একটি বাসের সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। যশোর, মাগুরা ও সাতক্ষীরাগামী যাত্রী বেশি।
তবে সব পরিবহনের চিত্র এক নয়। ছোট কিছু পরিবহন প্রতিষ্ঠান যাত্রী সংকটে ভুগছে। শৈলকুপা পরিবহনের টিকিট বিক্রেতা মো. রিয়াদ জানান, যাত্রী সংখ্যা বেশি মনে হলেও তা বিভিন্ন রুটে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে নির্দিষ্ট রুটে পর্যাপ্ত যাত্রী না থাকায় সময়মতো বাস ছাড়তে পারছেন না তারা।
অন্যদিকে গুলিস্তান এলাকা থেকেও বরগুনা, বরিশাল, গোপালগঞ্জ ও নড়াইলগামী যাত্রীরা একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
বরগুনাগামী যাত্রী যোবাইর রহমান জয় বলেন, পরিবারের সদস্যদের আগেই গ্রামে পাঠিয়েছেন। কিন্তু পরে গিয়ে এমন সংকটে পড়বেন তা ভাবেননি।
ভাড়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক যাত্রী। বরিশালের যাত্রী আহমেদুল হাসান জানান, যেখানে নন-এসি বাসের ভাড়া ৫০০ টাকার মধ্যে থাকার কথা, সেখানে নিম্নমানের বাসেও ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
তবে গাবতলীতে থাকা বিআরটিএ ভিজিল্যান্স টিম জানিয়েছে, অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ তারা পাননি। তারা বলছেন, যাত্রী সংখ্যা বেশি মনে হলেও রুটভিত্তিক বিভাজনের কারণে অনেক বাস মালিক পর্যাপ্ত যাত্রী না পেয়ে দেরিতে বাস ছাড়ছেন।
তবে মহাখালী বাস টার্মিনালে তুলনামূলক স্বস্তির চিত্র দেখা মিলল। এখান থেকে ময়মনসিংহ ও উত্তরাঞ্চলের রুটে পর্যাপ্ত বাস চলাচল করছে।
পরিবহন কর্মীরা জানিয়েছেন, ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত একাধিক বাস ছেড়ে গেছে এবং প্রতিটি বাসেই যাত্রী পূর্ণ ছিল। বর্তমানে সড়কেও তেমন যানজট নেই, ফলে যাত্রীরা নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন।
সিলেটগামী যাত্রী ও কাপড় ব্যবসায়ী জয়নাল ব্যাপারী জানান, ঈদের আগে ব্যবসার কারণে গ্রামে যেতে পারেননি। তাই এখন পরিবার নিয়ে যাচ্ছেন।
একইভাবে অনেকেই ঈদের আগে কাজের ব্যস্ততায় ঢাকায় থেকে এখন গ্রামে যাচ্ছেন—কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে, কেউ বিয়েসহ সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টার্মিনালজুড়ে তৎপর থাকলেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এদিকে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামীকাল সোমবার (২৩ মার্চ) থেকে ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ বাড়তে পারে।