দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে রাজধানীর নয়াপল্টনে অবস্থিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল দলটির আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নেতাকর্মীদের আনাগোনা, সংবাদ সম্মেলন, মিছিলের প্রস্তুতি, কৌশল নির্ধারণ, সব মিলিয়ে সরগরম থাকত পুরো এলাকা।
গণমাধ্যমকর্মীদেরও ছিল ব্যস্ত উপস্থিতি। প্রায় প্রতিদিনই দলীয় ব্রিফিং করতেন সিনিয়র নেতারা। নানা কর্মসূচি, বৈঠক এবং সাংগঠনিক আলোচনা ঘিরে নয়াপল্টনের এই কার্যালয়টি ছিল বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির নিরঙ্কুশ জয় ও সরকার গঠনের পর দৃশ্যপটে এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। যে কার্যালয় একসময় নেতাকর্মীদের কোলাহলে মুখর থাকত, সেটি এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ।
দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক বাস্তবতার স্বাভাবিক রূপান্তর। সরকার গঠনের পর সাংগঠনিক কাঠামো এবং কাজের ধরনে এসেছে পরিবর্তন। দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা নেতাদের বড় একটি অংশ এখন নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় সংগঠন গোছানো ও স্থানীয় রাজনৈতিক কার্যক্রমে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়েও। সেখানে মূলত চেয়ারপারসনের দপ্তর, বিস্তার কমিটির সদস্য এবং দলটির মিডিয়া সেল কার্যক্রম পরিচালনা করে।
অন্যদিকে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রয়েছে বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের দপ্তর, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, সংবাদ সম্মেলন কেন্দ্র এবং একটি মিলনায়তন। অতীতে এসব স্থানে নিয়মিত বৈঠক, আলোচনা এবং কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হলেও বর্তমানে কার্যক্রম তুলনামূলক কম।
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি এবং চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের কেন্দ্রীয় স্থায়ী কমিটির অনেক সদস্য এখন সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে সচিবালয়, মন্ত্রণালয় এবং নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা এখন তাদের প্রধান কর্মক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জন্য একটি নির্দেশনা রয়েছে—যে পদেই থাকুন না কেন, প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করতে হবে। ফলে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতির সুযোগ অনেকটাই কমে গেছে।
তবে এই ব্যস্ততা শুধু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদেরও সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফলে কেন্দ্রের পরিবর্তে তৃণমূল পর্যায়ে কার্যক্রম বাড়ানোর দিকেই এখন বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন হওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তির অনুভূতি কাজ করছে। আন্দোলনের চাপ কমেছে, কিন্তু দায়িত্ব বেড়েছে। একদিকে আমরা সরকার পরিচালনা করছি, অন্যদিকে সংগঠনকে দীর্ঘমেয়াদে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর কাজ চলছে।’
এই সিনিয়র নেতার মতে, রমজান মাস চলমান থাকায় এবং সামনে ঈদ থাকায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিতিও তুলনামূলক কম। ঈদের পর আবারও কার্যালয় সরগরম হয়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ঢাকা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির সিনিয়র নেতা আমানুল্লাহ আমানও একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রমজান মাসে ইফতার আয়োজন এখন রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের পরপরই রমজান শুরু হয়েছে। আমরা এখন নিজ নিজ এলাকায় যাচ্ছি, মানুষের সঙ্গে দেখা করছি, নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা করছি। এলাকার উন্নয়ন এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের বিষয়গুলোই এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে।’
তার মতে, রমজানে দলীয় কর্মসূচি তুলনামূলক কম থাকে। ফলে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও কম দেখা যাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ সজল বলেন, ‘বর্তমানে পার্টি অফিসে তেমন বড় কোনো কার্যক্রম নেই। অধিকাংশ নেতা নিজ নিজ এলাকায় ব্যস্ত থাকায় কর্মীরাও তাদের সঙ্গেই কাজ করছেন। ফলে নয়াপল্টনের কার্যালয়ে উপস্থিতি কম থাকাটা স্বাভাবিক।’
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচনের পর নেতাকর্মীরা নিজ নিজ এলাকায় সাংগঠনিক কাজ জোরদার করেছেন। সে কারণে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিতি কিছুটা কমেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দলীয় কর্মকাণ্ডে অবদান রাখা নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের বিষয়ে দলীয় প্রধান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। অতীতে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়া, জেল খাটা কিংবা আহত হওয়া সাবেক ছাত্রদল নেতাদের মধ্য থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জনকে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী করা হয়েছে।’
অন্য নেতাকর্মীদেরও ধাপে ধাপে সাংগঠনিক পদ-পদবীর মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জানা যায়, সরকার গঠনের পর বর্তমানে বিএনপির অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে।
তবে সেখানেও নির্বাচনে বিজয়ের পর যে ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য প্রত্যাশা করা হয়েছিল, বাস্তবে তার তুলনায় পরিবেশ অনেকটাই শান্ত ও কোলাহলহীন বলে মনে করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া সেলের সদস্য শামসুদ্দিন দিদার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দল ও ক্ষমতাসীন দলের কার্যালয়ের কার্যক্রমে স্বাভাবিকভাবেই পার্থক্য থাকে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পলিটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘নির্বাচন-পূর্ব সময়ে প্রচারণা, মনোনয়ন প্রত্যাশা এবং কৌশলগত বৈঠককে ঘিরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল স্বাভাবিকভাবেই সরব ও কর্মচাঞ্চল্যে পূর্ণ।’ তবে সরকার গঠনের পর দৃশ্যমান জনসমাগম কমে আসা রাজনীতির একটি স্বাভাবিক রূপান্তর বলেই তিনি মনে করেন।
তার মতে, আন্দোলন ও নির্বাচনমুখী সক্রিয়তা থেকে প্রশাসনিক দায়িত্বে অগ্রসর হলে দলীয় তৎপরতার বড় অংশ স্থানান্তরিত হয় সরকারি দপ্তর এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। ফলে কার্যালয়কেন্দ্রিক উপস্থিতি কমলেও সেটি সংগঠনের স্থবিরতার ইঙ্গিত নয়।
তিনি বলেন, ‘নয়াপল্টনের নীরবতা আসলে একটি রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রতীক। দীর্ঘ প্রতিরোধ ও আন্দোলনের রাজনীতি থেকে বিএনপি এখন প্রশাসনিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।’
ফলে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দৃশ্যমান কোলাহল কমে গেলেও দলীয় কার্যক্রমের ধরন ও অগ্রাধিকার যে নতুন বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে, নয়াপল্টনের এই পরিবর্তিত পরিবেশ তারই প্রতিফলন।