বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এই রোগ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখন এই রোগকে মেটাবলিক ডিসফাংশন অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (এমএএসএলডি) নামে ডাকা হয়, যা আগে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এনএএফএলডি) নামে পরিচিত ছিল।
ফ্যাটি লিভার বলতে, লিভারে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি চর্বি জমে যাওয়াকে বোঝায়। সাধারণত অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরল সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। তবে শুধু অতিরিক্ত ওজনের মানুষই নয়, অনেক রোগা মানুষও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।
আগে ফ্যাটি লিভারকে তুলনামূলক সাধারণ সমস্যা মনে করা হলেও এখন চিকিৎসকেরা এটিকে নীরব ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। কারণ শুরুতে রোগটির তেমন লক্ষণ না থাকলেও সময়ের সঙ্গে এটি লিভারের গুরুতর ক্ষতি করতে পারে। অবহেলা করলে একপর্যায়ে লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিওর এমনকি লিভার ক্যানসারের আশঙ্কাও তৈরি হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রোগটির প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে- সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগা, দুর্বলতা, পেটের ডান পাশে অস্বস্তি বা ব্যথা, ক্ষুধামন্দা এবং পেট ফাঁপার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। রোগ জটিল হলে ত্বকে চুলকানি, পা ফুলে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট এবং চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক জীবনযাপনই ফ্যাটি লিভারের অন্যতম বড় কারণ। এছাড়াও অতিরিক্ত ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং ব্যায়ামের অভ্যাস না থাকায় শরীরে চর্বি জমতে থাকে, যা পরে লিভারেও প্রভাব ফেলে। এছাড়া ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা, উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড এবং পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঝুঁকি আরও বেশি।
সব ধরনের ফ্যাটি লিভার একই রকম নয়। কারও ক্ষেত্রে শুধু চর্বি জমে থাকে, আবার কারও লিভারে প্রদাহ তৈরি হয়। দীর্ঘদিন প্রদাহ চলতে থাকলে লিভারে ক্ষত বা ফাইব্রোসিস তৈরি হতে পারে, যা ধীরে ধীরে লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে। চিকিৎসা না নিলে পেটে পানি জমা, খাদ্যনালীর শিরা ফুলে যাওয়া ও রক্তক্ষরণ, মানসিক বিভ্রান্তি, প্লাটিলেট কমে যাওয়া, লিভার ক্যানসার এবং শেষ পর্যন্ত লিভার সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলেই অনেকাংশে ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
১. নিয়মিত ব্যায়াম করা,
২. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা,
৩. চিনি ও কোমল পানীয় কম খাওয়া,
৪. বেশি করে শাকসবজি ও ফল খাওয়া,
৫. অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা,
৬. পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানোর মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো সচেতনতা ও চিকিৎসা নিলে ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই দীর্ঘদিন ক্লান্তি, হজমের সমস্যা বা পেটের অস্বস্তি থাকলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র: মায়ো ক্লিনিক