বিশ্লেষণ
রাজধানীর পল্লবীর আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় রায় ঘোষণা করেছে ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল। আদালত প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। পাশাপাশি তাদের অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। নৃশংস এ ঘটনার বিচারিক রায় এত অল্প সময়ে হওয়ায় দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আইনজীবী ও বিচার বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি বাংলাদেশের অন্যতম দ্রুততম বিচার।
রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তদন্তকারী সংস্থা দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র জমা দেয়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক ও বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে আদালত রায় ঘোষণা করেন। ফলে ঘটনাটি শুধু একটি নৃশংস অপরাধের বিচার হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার গতি ও সক্ষমতা নিয়ে নতুন আলোচনারও জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশে আলোচিত অপরাধের দ্রুত বিচার নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই প্রথম দিকে আসে ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার নাম। ২০১৯ সালের এপ্রিলে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রত্যাহার না করায় নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। সেই মামলায় তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় আসে প্রায় ২০৯ দিনের মাথায়। সে সময় এটিকে দেশের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুত বিচার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন সংশ্লিষ্টরা।
এরপর আলোচনায় আসে বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলা। ২০১৯ সালের জুনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যার সেই ভিডিও সারা দেশে আলোড়ন তুলেছিল। তবে সেই মামলায় রায় পেতে সময় লাগে প্রায় ৫৪৮ দিন। বিচারিক প্রক্রিয়ার গতি তুলনামূলকভাবে দ্রুত হলেও রামিসা বা নুসরাত মামলার সঙ্গে তুলনা করলে সময়ের ব্যবধান অনেক বেশি।
সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত বিচারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলা। দেশজুড়ে আলোচিত সেই ঘটনায় বিচার শুরু হওয়ার পর মাত্র ২৪ দিনের মধ্যে রায় ঘোষণা করা হয়। অনেক আইনজীবী তখন মন্তব্য করেছিলেন, রাষ্ট্র চাইলে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব।
সংখ্যার হিসাবে বিচার করলে দেখা যায়, আলোচিত এসব মামলার মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত রায় এসেছে রামিসা মামলায়। আছিয়া মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হতে লেগেছিল ২৪ দিন, নুসরাত মামলায় প্রায় ২০৯ দিন, রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় প্রায় ৫৪৮ দিন এবং আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায় আসতে সময় লেগেছিল দুই বছরেরও বেশি। সেই তুলনায় ১৯ দিনে রায় বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা বলেই মনে করছেন আইন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিচার বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দ্রুত বিচার এবং ন্যায়বিচার, দুই বিষয়কে একসঙ্গে দেখতে হবে। বিচার যত দ্রুতই হোক, তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার মান বজায় রাখা জরুরি। কারণ বিচারিক আদালতের রায়ের পর উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স, আপিল এবং অন্যান্য আইনি ধাপ বাকি থাকে। ফলে বিচারিক আদালতের রায় দ্রুত এলেও পুরো আইনি প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও সময় লাগতে পারে।
মানবাধিকার কর্মী এবং আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, আলোচিত মামলাগুলোতে সাধারণত জনমতের প্রবল চাপ, গণমাধ্যমের নিবিড় নজরদারি ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের কারণে দ্রুত অগ্রগতি দেখা যায়। কিন্তু দেশের অসংখ্য নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ভুক্তভোগীরা বছরের পর বছর বিচারের অপেক্ষায় থাকেন। ফলে রামিসা মামলার দ্রুত বিচার যেমন স্বস্তি দেয়, তেমনি বিচারব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
বাংলাদেশে বর্তমানে লাখ লাখ মামলা বিচারাধীন। সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মামলাজট বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সেই বাস্তবতায় রামিসা মামলার ১৯ দিনের বিচার একদিকে যেমন রাষ্ট্রের সক্ষমতার উদাহরণ, অন্যদিকে তেমনি একটি প্রশ্নও সামনে আনে, এই গতি কি শুধু আলোচিত কয়েকটি মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে সব ভুক্তভোগীই সময়মতো ন্যায়বিচার পাবেন?
রামিসা মামলার রায় তাই কেবল একটি শিশুর জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় দ্রুত বিচারের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা, দুই দিকই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।