রাজধানীর মিরপুরে ফ্ল্যাটে বৃদ্ধার ‘করুণ মৃত্যু’ ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে উঠেছে সমালোচনার ঝড়। বৃদ্ধার নাম নূরজাহান বেগম। তিনি কবে মারা গেছেন, বলতে পারেন না সন্তানরা। পুলিশ জানায়, ওই বৃদ্ধার সন্তানরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত। উনার ছেলেদের মধ্যে একজন যুগ্ম সচিব, আরেকজন বুয়েটের শিক্ষক। এ ছাড়া উনার একটা মেয়ে আছে, যিনি স্থানীয় একটা স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ওই মেয়ের সঙ্গেই তিনি থাকতেন।
স্যাঁতসেতে নোংরা যে ঘরটিতে বৃদ্ধা নূরজাহান বেগম মারা গেছেন, ইতোমধ্যেই সেটির ছবি এবং ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। সেগুলো দেখার পর অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। অবহেলার অভিযোগ তুলে সন্তানদের শাস্তিও দাবি করছেন কেউ কেউ। বিষয়টি নিয়ে হাই কোর্টে একটি রিট আবেদনও করা হয়েছে।
এদিকে, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানান, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়াত বৃদ্ধার যুগ্ম-সচিব ছেলের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন তারা। ইতিমধ্যে বুধবার ওই যুগ্মসচিবকে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
কিন্তু বয়স্ক বাবা-মায়ের দেখা-শোনার ব্যাপারে বাংলাদেশের আইনে ঠিক কী বলা আছে? কোনো সন্তান যদি ওই আইন না মানেন, সেক্ষেত্রে তাকে কী ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে?
আইন কী বলে
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতির রীতি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ছেলে-মেয়েরাই সাধারণত বাবা-মাকে বৃদ্ধ বয়সে দেখে শুনে রাখেন। তবে বিষয়টি নিয়ে অতীতে বিভিন্ন সময় নানা অভিযোগ ওঠার কারণে ২০১৩ সালে এ নিয়ে একটি আইনও পাস করে সরকার।
‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ নামের ওই আইনে প্রতিটি সামর্থ্যবান ছেলে-মেয়েকে তার বাবা-মায়ের ভরণপোষণ তথা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, সঙ্গ ও সেবা প্রদানসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
আইনে আরও বলা হয়, কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ভরণপোষণ নিশ্চিত করবেন। পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সন্তানদেরকে তাদের সঙ্গে একই স্থানে বসবাস করতে হবে। বাবা-মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদেরকে কোনো বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করা যাবে না।
চাকরি বা অন্য কোনো কারণে সন্তানরা পিতা-মাতার কাছ থেকে দূরে অবস্থান করলে নিয়মিতভাবে তাদেরকে বাবা-মায়ের খোঁজ-খবর নেওয়া এবং দেখা-সাক্ষাৎ করার কথাও আইনে বলা হয়েছে। পাশাপাশি, বাবা-মাকে নিয়মিতভাবে যৌক্তিক পরিমাণ টাকা-পয়সা প্রদান করার কথাও রয়েছে আইনে।
আইন অনুযায়ী, ছেলে-মেয়ের অনুপস্থিতিতে নাতি-নাতনিরা তাদের বৃদ্ধ দাদা-দাদী বা নানা-নানীর দেখাশোনা করবেন। কেউ যদি এই আইন না মানে, সেক্ষেত্রে তাকে অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা জরিমানা বা অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানদের কেউ যদি এই আইন বাস্তবায়নে বাধা দেন, তাহলে তিনি একই শাস্তি ভোগ করবেন বলে আইনে বলা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত যুগান্তকারী একটি আইন। প্রচারণার মাধ্যমে এই আইন সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা এবং এটি প্রয়োগ করে শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করা গেলে মিরপুরের ঘটনার মতো ঘটনা আর ঘটবে না বলে আমি মনে করি।’