দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন নার্স ও মিডওয়াইফরা। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী রোগীদের সার্বক্ষণিক সেবাদানের পাশাপাশি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সেবায়ও তারা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। সরকারি নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি নার্সিং কলেজগুলোও দীর্ঘদিন ধরে নার্স ও ধাত্রী তৈরিতে ভূমিকা রেখে আসছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে জনবল সরবরাহে এসব প্রতিষ্ঠানের অবদান বাড়লেও শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং ভাতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বরিশালের রাজধানী নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ সেলিনা আক্তার জানান, আমাদের কারিকুলাম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে তিন দিন কলেজে তাত্ত্বিক ক্লাস করতে হয় এবং বাকি তিন দিন হাসপাতালে গিয়ে সরাসরি রোগীদের সাথে প্র্যাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক কাজ করতে হয়।
তিনি আরও জানান, বিএসসি ইন নার্সিং চার বছরের কোর্স, ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি তিন বছরের এবং ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি তিন বছরের কোর্স। এছাড়া উচ্চতর শিক্ষার জন্য এমএসসি নার্সিংও রয়েছে। এই দীর্ঘ পড়াশোনা শেষে শিক্ষার্থীদের টানা ৬ মাসের ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে হয়। এরপর বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল (বিএনএমসি) আয়োজিত চূড়ান্ত লাইসেন্সিং পরীক্ষায় পাস করার পরেই কেবল তারা পেশাগত জীবনে প্রবেশের সুযোগ পান।
এই ব্যবহারিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে বরিশাল সরকারি নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ হোসনেরা আখতার এবং একই কলেজের শিক্ষক ডা. মো. আলী আজগর জানান, নার্সিং শিক্ষার মূল কথাই হলো ‘কাজের মাধ্যমে শেখা’। ল্যাবে পুতুলের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে শেখানো সম্ভব হলেও, মানবদেহ বা জীবন্ত মানুষ নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। হাসপাতালে সরাসরি কাজ করলেই শিক্ষার্থীদের দক্ষতা স্থায়ী রূপ নেয়।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. এ কে এম নাজমূল আহসান বলেন, ‘দক্ষ নার্সের কোনো বিকল্প নেই। সিসিইউ বা আইসিইউর মতো সংবেদনশীল জায়গায় কাজ করতে হলে উচ্চমানের দক্ষতা প্রয়োজন। আমাদের হাসপাতালে সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্র্যাকটিস করছে, যার ফলে রোগীরাও উপকৃত হচ্ছে, শিক্ষার্থীরাও কাজ শিখছে।
ঘাটতি পূরণে বেসরকারি শিক্ষার্থীদের অবদান বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি বড় সংকট হলো নার্সের স্বল্পতা। বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম একটি বড় বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে বলেন, বিগত দিনে দেশে প্রচুর চিকিৎসক নিয়োগ হলেও সেই তুলনায় নার্স নিয়োগ হয়নি। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, যে হাসপাতালে ৬০ জন চিকিৎসক থাকবেন, সেখানে তার অন্তত তিন গুণ নার্স থাকা উচিত।
এই জনবল সংকটের মাঝে বেসরকারি নার্সিং শিক্ষার্থীরা সরকারি হাসপাতালগুলোতে এক বিশাল সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। বরিশাল সরকারি নার্সিং কলেজের সিনিয়র স্টাফ নার্স বাসন্তী রানী বিশ্বাস অকপটে স্বীকার করেন, হাসপাতালে অনেক সময় ৫ জনের কাজ ২ জনকে করতে হয়। সরকারি নার্সদের কাজের এত চাপ থাকে যে শিক্ষার্থীদের আলাদা করে সময় দেওয়া কঠিন হয়। তবে এই শিক্ষার্থীরা যখন হাসপাতালে ডিউটি করে, তখন আমাদের কাজের কষ্ট অনেকটাই কমে যায়। তারা না থাকলে হাসপাতাল চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীরাও এই শিক্ষার্থীদের সেবায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কয়েকজন সেবাগ্রহীতা জানান, সিনিয়র নার্সরা যখন অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন এই শিক্ষার্থীদের ডাকলেই তারা সাধ্যমতো এগিয়ে আসেন এবং পরম যত্নে সেবা দেন।
নার্সিংয়ের পাশাপাশি ‘মিডওয়াইফারি’ বা ধাত্রীবিদ্যা এখন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা। অধ্যক্ষ সেলিনা আক্তার বলেন, মিডওয়াইফদের দায়িত্ব অনেক বেশি, কারণ এখানে একটি নয়, দুটি জীবন জড়িয়ে থাকে—মা এবং শিশু। একজন দক্ষ মিডওয়াইফই পারেন প্রসবকালীন জটিলতা দূর করে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র তুলে ধরে বরিশাল সরকারি নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ হোসনেরা আখতার বলেন, আমাদের সমাজে একজন নার্স বা মিডওয়াইফকে একা ৮০ জন পর্যন্ত রোগীর দেখাশোনা করতে হয়। প্রসব বেদনায় কাতর একজন মায়ের পাশে যখন ৫-৬ জন দর্শনার্থী এসে ভিড় করেন, তখন ভিড়ের কারণে সেবা ব্যাহত হয়। মানুষ ভাবে মিডওয়াইফ অবহেলা করছে, কিন্তু বাস্তবে অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে এমনটা ঘটে। তাই প্রতিটি প্রসূতি মায়ের জন্য আলাদা মিডওয়াইফ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বেসরকারি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থীদের এই কঠোর পরিশ্রমের পেছনে কোনো সরকারি আর্থিক সহায়তা বা ভাতা নেই। রাজধানী নার্সিং কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নিয়াম এবং সানজিদা আক্তার মিম জানান, ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের মাধ্যমে তারা রোগীদের একদম কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পান, যা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। কিন্তু সরকারি শিক্ষার্থীরা ইন্টার্নশিপের সময় ভাতা পেলেও বেসরকারি শিক্ষার্থীরা কোনো টাকা পান না। শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ নিজেদের বা অভিভাবকের খরচে এই পড়াশোনা ও হাসপাতালের দায়িত্ব পালন করতে হয়।
একই কলেজের শিক্ষার্থী অঙ্কিতা হালদার এবং ৩য় বর্ষের ছাত্রী সাথী আক্তার বলেন, ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস আমাদের শিক্ষাক্রমের বাধ্যতামূলক অংশ। এটি করতে না পারলে আমাদের দক্ষতার ঘাটতি থেকে যাবে, যা পরবর্তীতে পূরণ করা সম্ভব নয়। আমরা চাই সরকার যেন বেসরকারি শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ আরও সহজ ও উন্নত করে দেয়।
অন্যদিকে, বরিশালের ডিডাব্লিউএফ নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের তৈরি দক্ষ নার্সরা দেশের স্বনামধন্য বড় বড় হাসপাতাল ছাড়িয়ে আজ বিদেশের মাটিতেও সুনামের সাথে কাজ করছেন। তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করে বলেন, সরকার যদি প্রতিটি বেসরকারি নার্সিং কলেজের জন্য নিজস্ব হাসপাতাল বা প্র্যাকটিস ফিল্ডের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেয়, তবে শিক্ষার্থীরা আরও নির্বিঘ্নে শিখতে পারবে।
তবে এই পেশার মর্যাদা ও সেবার মান আরও বাড়াতে নার্সিং নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষকেরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অধ্যক্ষ হোসনেরা আখতার বলেন, আমরা নার্সরা সমাজে এখনো কিছুটা অবহেলিত। আমাদের সঠিক মূল্যায়ন ও সমতা দরকার। মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রথম দুটি হলো খাদ্য ও বস্ত্র। নার্সদের বেতন ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করলে তাদের মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, যার ফলে তারা রোগীদের আরও শতভাগ উজাড় করে সেবা দিতে পারবেন।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সরকারি সুবিধার পাশাপাশি বেসরকারি নার্সিং শিক্ষার এই অগ্রযাত্রাকে টিকিয়ে রাখা এবং তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার হালিমা আক্তার বলেন, স্বাস্থ্য শিক্ষার ক্ষেত্রে নার্সিং শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস এবং ইন্টার্নশিপ অত্যন্ত জরুরি।
তিনি পাঠ্যক্রমের ওপর জোর দিয়ে বলেন, কারিকুলাম ও সিলেবাস অনুযায়ী ল্যাব প্র্যাকটিসসহ সশরীরে (হাতে-কলমে) প্রশিক্ষণ নেওয়াটা অত্যন্ত আবশ্যক। একজন শিক্ষার্থীর যদি শতভাগ ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস না থাকে, তবে পরবর্তী সময়ে কর্মক্ষেত্রে সে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। তাই নার্সিং শিক্ষায় ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের গুরুত্ব অপরিসীম।
শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি, শিক্ষার্থীরা যখন ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে যাবে, তখন তারা হাসপাতালের সব স্টাফদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে এবং তা নিজেরা অনুশীলনের মাধ্যমে আয়ত্ত করবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের নার্সদের চাহিদা ও যোগ্যতার বিষয়ে রেজিস্ট্রার বলেন, আমরা যদি আন্তর্জাতিক নার্সিং মার্কেট ধরতে চাই, তবে থিওরিক্যাল (তাত্ত্বিক) জ্ঞানের পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস সমানভাবে জরুরি। এর বাইরে অন্যান্য যে ফ্রি সার্ভিস বা আনুষঙ্গিক সেবাগুলো রয়েছে, সেগুলোও তাদের শিখতে হবে।
এই লক্ষ্য অর্জনে সামাজিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস করার সুযোগ দিতে আমাদের সমাজের সকলের সাপোর্ট প্রয়োজন। তাদের জন্য হাসপাতালে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেই উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। অন্যথায়, শিক্ষার্থীরা নিজেদের মাঝে প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারবে না।