বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হাম তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সরকার। সরকারি হিসাবে, হাম ও এ রোগের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৮৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে অন্তত ৬৫২ শিশু।
এত প্রাণহানির জন্য সরকারের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. বে-নজির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, সময়মতো যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে এত মৃত্যু হতো না। তার মতে, হামকে মহামারি ঘোষণা করে জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা জারি না করাটা সরকারের বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে সরকার। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত গণমাধ্যমটিকে বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৫ দিনের মাথায় হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয় এবং সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হতে পারত।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে বিবিসি এক প্রতিবেদনে সোমবার (১৫ জুন) বলেছে, হামের ওয়ার্ডগুলো এখনো রোগীতে পূর্ণ। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে শয্যার চাপ অব্যাহত রয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক রোগী জটিলতা তৈরি হওয়ার পর ঢাকায় আসায় তাদের বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না।
হামে আক্রান্ত হয়ে সন্তান হারানো পরিবারগুলোর দুর্ভোগও বাড়ছে। রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ভর্তি একাধিক শিশুর স্বজনরা জানিয়েছেন, সন্তানদের চিকিৎসার জন্য তাদের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে, অনেকেই ধারদেনা করে চিকিৎসার খরচ চালাচ্ছেন।
সরকারের দাবি, চলমান পরিস্থিতির জন্য বিগত আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়ী। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, প্রতি চার বছর পরপর এমআর টিকার ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর তা করা হয়নি, যার প্রভাব এখন পড়ছে।
এদিকে হাম পরিস্থিতি কীভাবে এ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তদন্ত শুরু করেছে। একই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (ডব্লিউএইচও) একটি স্বাধীন তদন্তের অনুরোধও জানিয়েছে সরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামকে শুরুতেই মহামারি ঘোষণা করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সুবিধা, আইসিইউ ও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ জোরদার করা গেলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না। তাদের আশঙ্কা, শতভাগ শিশুকে এখনো টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে, ফলে সামনের দিনগুলোতে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।