একটি ছবি, ভিডিও কিংবা কয়েকটি শব্দ, হাস্যরসের মোড়কে যখন কোনো ধারণা, বিশ্বাস বা চিন্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, সেগুলোই হয়ে ওঠে মিম। মিমগুলো ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কনটেক্সট ধরে সামান্য পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। তবে আপাতদৃষ্টিতে নিছক বিনোদন মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাষ্য।
‘মিম’ শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ ‘মিমেমা’ থেকে, যার অর্থ ‘অনুকরণ’। ১৯৭৬ সালে ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স তার ‘দি সেলফিশ জিন’ বইয়ে প্রথম ‘মিম’ ধারণাটির উপস্থাপন করেন। তিনি মিমকে কল্পনা করেছিলেন জিনের সাংস্কৃতিক সমান্তরাল হিসেবে। জিন যেমন নিজের প্রতিলিপি তৈরি করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকে, তেমনি মিমগুলোও ধারণা ও তথ্য বহন করে একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এগুলো অনুকরণযোগ্য, বিবর্তনশীল ও সময়ের সঙ্গে নিজেদের রূপ বদলাতে সক্ষম।
সাধারণভাবে মিম তৈরি হয় মানুষকে হাসানোর জন্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই হাস্যরস কি কখনো বিপ্লবের জন্ম দিতে পারে?
বর্তমান বিশ্বে যোগাযোগের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়া। আর এই মাধ্যমে কোনো বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হয়ে উঠেছে মিম। ফলে মিম আর এখন নিছক মজা নয়, অনেক সময় এটি হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা ও রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের মাধ্যম।
‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন এটির এক বড় দৃষ্টান্ত। জর্জ ফ্লয়েড হত্যার পর তার শেষ কথা ‘আই ক্যান্ট ব্রিদ’ নিয়ে তৈরি হওয়া অসংখ্য মিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব মিম শুধু সহানুভূতির প্রকাশ ছিল না, এগুলো দ্রুত আন্দোলনকে বৈশ্বিক মাত্রা দেয়। কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার, পুলিশি বর্বরতা ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে এই ডিজিটাল প্রতিবাদ।
একইভাবে #MeToo আন্দোলন হ্যাশট্যাগ দিয়ে শুরু হলেও, এর বিস্তারে মিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নির্যাতিত নারীদের অভিজ্ঞতা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিমের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পায়। ফলে বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি বৈশ্বিক আন্দোলনে রূপ নেয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও মিমের শক্তি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। জুলাই আন্দোলনের সময় ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া মিমগুলো আন্দোলনের গতি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। আবু সাঈদের মৃত্যুর পর তাকে কেন্দ্র করে তৈরি মিম সাধারণ মানুষের আবেগে নাড়া দেয়। সরকারবিরোধী এসব মিম আন্দোলনকে এতটাই ত্বরান্বিত করে যে একপর্যায়ে সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। এতেও আন্দোলনের গতি থামেনি। শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ঘটে। ডিজিটাল স্পেসে জন্ম নেওয়া এই প্রতিরোধ বাস্তব রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
শুধু মুক্ত সমাজেই নয়, কঠোর সেন্সরশিপের মাঝেও মিম হয়ে ওঠে প্রতিবাদের গোপন ভাষা। চীনের নেটিজেনরা সরকারি নিয়ন্ত্রণ এড়াতে তৈরি করে ‘গ্রাস-মাড হর্স’ নামের একটি কাল্পনিক প্রাণীর মিম। চীনা ভাষায় এর উচ্চারণ একটি গালির সঙ্গে মিলে যায়। ফলে এটি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রুপ ও ক্ষোভ প্রকাশের এক ধরনের কোড ল্যাঙ্গুয়েজে পরিণত হয়।
২০১৯ সালে জনপ্রিয় হওয়া ‘ওকে বুমার’ মিমটিও একটি প্রজন্মগত প্রতিবাদের প্রতীক। রক্ষণশীল মনোভাবের বিরুদ্ধে যুবসমাজের অসন্তোষ প্রকাশের হাতিয়ার হয়ে ওঠে এটি। নিউজিল্যান্ডের সংসদে ‘জিরো কার্বন বিল’ নিয়ে বিতর্ক চলাকালে এক এমপি শব্দটি ব্যবহার করলে মুহূর্তেই তা মিমের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা জলবায়ু পরিবর্তন বিরোধী রক্ষণশীল মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
মিম শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনেই নয়, সামাজিক সচেতনতা তৈরিতেও কার্যকর। আইস বাকেট চ্যালেঞ্জ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ভাইরাল মিমের মাধ্যমে অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস (এএলএস) রোগ সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি হয় এবং এর গবেষণার জন্য প্রায় ২২ কোটি ডলার সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
তবে মিমের শক্তি যেমন ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, তেমনি এর ভয়ংকর দিকও রয়েছে। সহিংস উগ্রবাদ ছড়ানোর ক্ষেত্রেও মিম ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৮৪ সালের চলচ্চিত্র সিভিল ওয়ার-২ : ইলেক্ট্রিক বুগালু থেকে জন্ম নেওয়া ‘বুগালু বয়েজ’ মিম যুক্তরাষ্ট্রে সরকারবিরোধী, সশস্ত্র উগ্রবাদী আন্দোলনে রূপ নেয়। এমনকি মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমারকে অপহরণের পরিকল্পনাও করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীলতার এই যুগে মিমের ক্ষমতা আকাশছোঁয়া। সচেতনতা হোক কিংবা গুজব ছড়ানো, অধিকার আদায়ের ডাক কিংবা সহিংস উসকানি, সব ক্ষেত্রেই মিম হয়ে উঠেছে আধুনিক সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক অস্ত্র।
হাস্যরসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই ডিজিটাল বার্তাগুলো তাই আর অবহেলার নয়, বরং এগুলোই বলে দেয় একটি মিম কখনো কখনো আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠতে পারে।