বাংলাদেশের ব্যস্ত কোনো মোড়ে দাঁড়িয়ে আপনি যদি সামান্য জোরে ‘মেহেদী’ বলে ডাক দেন, তাহলে কিছুটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে। দু-একজন ঘুরে তাকাবে, আরেকজন একটু সন্দেহ নিয়ে দেখবে, কেউ হয়তো হাঁটার গতি কিছুটা কমিয়ে ভাববে, ‘আমাকেই নাকি!’ এই ছোট্ট দৃশ্যটা বাংলাদেশের এক বড় বাস্তবতা। কিন্তু নামটি এমন হলো কীভাবে?
আরব থেকে বাংলায় যাত্রা
‘মেহেদী’ নামটির উৎপত্তি সুদূর আরবে, ‘মাহদি’ থেকে। আরবি ভাষায় মাহদি শব্দের অর্থ ‘সৎপথে পরিচালিত।’ প্রথম দিকে শব্দটি উপাধি কিংবা কাউকে বর্ণনা করতে ব্যাবহার করা হতো, নির্দিষ্ট ব্যক্তিনাম হিসেবে নয়। ইসলামে ইমাম মাহদির ধারণা নাম হিসেবে শব্দটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। বিশ্বাস করা হয়, একসময় ইমাম মাহদি এসে পৃথিবীতে ন্যায়বিচার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন।
ইতিহাস বলছে, আবার বলছেও না
বাংলা অঞ্চলের ‘প্রথম মেহেদী’ কে ছিলেন, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ইতিহাস প্রথমে একটু গম্ভীর হয়ে যায়, তারপর চুপ থাকে! কারণ, ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে যখন বাংলায় মুসলিম শাসন শুরু হয়, তখন আরবি-ফার্সি নামগুলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। ‘মাহদি’ সেখান থেকে এসে ‘মেহেদী’ হয়। কিন্তু তখন কেউ বসে বসে লিখে রাখেননি ‘আজ প্রথম মেহেদী জন্মগ্রহণ করলেন!’ তাই বলা যায়, নামটি এসেছে, ছড়িয়েছে, জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু তার প্রথম অধ্যায়টি রয়ে গেছে ইতিহাসের ফাঁকেই।
সংখ্যা যা বলে
জন্মনিবন্ধনের ডেটাবেজে নামভিত্তিক উন্মুক্ত পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। ফলে সরকারি হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশে ঠিক কতজন ‘মেহেদী’ রয়েছেন, তার কোনো সোজা উত্তর নেই। তবে বাস্তবতা বলছে—মেহেদী দেশের পুরুষদের সবচেয়ে প্রচলিত নামগুলোর একটি। ১৯৮০ থেকে ২০১০ সময়কালে জন্ম নেওয়া প্রজন্মে নামটির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত। ‘মেহেদী হাসান’ নামটি একাই লক্ষাধিক মানুষের কম্বিনেশন নাম।
তবে অনুমান বলছে, দেশের তরুণদের মধ্যে প্রায় ৫ থেকে ৭ শতাংশের নামের অংশে ‘মেহেদী’ রয়েছে। অর্থাৎ, আপনি যদি ১০-১৫ জন বন্ধুর মধ্যে দাঁড়ান, খুব সম্ভব একজন ‘মেহেদী’ আছেনই। নাহলে তিনি হয়তো পাশের টেবিলে বসে আছেন!
কেন এত জনপ্রিয়
নিরাপদ: মেহেদী এমন একটি নাম, যা নিয়ে কারও কোনো আপত্তি থাকে না। ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য, আর শুনতেও ভালো।
শ্রেণি-নিরপেক্ষতা: গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শহরের করপোরেট অফিস, সব জায়গায় ‘মেহেদী’ রয়েছে। ফলে নামটির মধ্যে সর্বজনীনতা পাওয়া যায়।
উচ্চারণে আরাম: নামটি সংক্ষিপ্ত, মোলায়েম এবং সহজে উচ্চারণযোগ্য।
সামাজিক পুনরাবৃত্তি: এক প্রজন্মে বেশি ব্যবহৃত নাম পরের প্রজন্মেও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। তাই নামটি ব্যবহৃত হতে হতে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। ফলে আরও ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইমাম মাহদী
ইসলামী চিন্তায় ইমাম মাহদী অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়, পৃথিবীতে যখন অন্যায়-অবিচার বেড়ে যাবে ও মানুষ নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে তখন তিনি আবির্ভূত হবেন। তিনি এসে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। সমাজে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনবেন ও মানুষের নৈতিক পুনর্জাগরণ ঘটাবেন। অনেক বর্ণনায় তার সময়কালকে নবী ঈসা (আ.)-এর পুনরাগমনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলা হয়। সুন্নি ও শিয়া মতাদর্শে কিছু পার্থক্য থাকলেও, একটি জায়গায় মিল রয়েছে, সেটি হলো ‘মাহদী মানে আশা’। আর সেই আশাটুকুই ‘মেহেদী’ নামের মধ্যে ছোট করে বসিয়ে দেওয়া হয়!
মেহেদি…
বাংলায় মেহেদি শব্দটি আবার ‘হেনা গাছ’-এর সঙ্গেও যুক্ত। যার পাতা দিয়ে বিভিন্ন উৎসবে, বিশেষ করে ঈদ ও বিয়েতে হাত রাঙানো হয়।
এতে নামটির মধ্যে এক অদ্ভূত দ্বৈততা পাওয়া যায়। ধর্মীয় অর্থে ‘সৎপথ’, নৈতিকতার সঙ্গে সাংস্কৃতিক অর্থ ‘উৎসব’ এবং রঙ ও সৌন্দর্য মিশে একটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করে। এতে নামটির প্রতি একটি নান্দনিক আকর্ষণও তৈরি হয়। কারণ, বাংলা ভাষায় এমন নাম খুব বেশি নেই, যেগুলো একই সঙ্গে ধর্মীয়, আধুনিক এবং কাব্যিক শোনায়। ‘মেহেদী’ সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি।
সংস্কৃতিতে মেহেদী
ক্রিকেট মাঠে মেহেদী হাসান মিরাজ যখন দৌড়ান, তখন মেহেদী নামটি জাতীয়ভাবে প্রতিধ্বনিত হয়। সংগীত, অভিনয় ও চলচ্চিত্র পরিচালনায়ও রয়েছেন মেহেদী নামের পরিচিত মুখ। ফলে নামটি শুধু ঘরের ভেতর থাকে না, এটি মাঠে যায়, মঞ্চে যায়, মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়। এবং এতক্ষণ ধরে কিবোর্ডে যিনি এত কথা লিখেছেন, তার নামও ‘মেহেদী।’
পরিবর্তন কী আসছে
আজকের দিনে অনেকে বলেন মেহেদী নামটা খুব কমন, নতুন মা-বাবা ইউনিক নাম খুঁজছেন। তারা চান তাদের সন্তানের নাম আলাদা হোক। কিন্তু তবুও, কোথাও না কোথাও কোনো বাবা-মা এখনো তার সন্তানের নাম রাখছেন ‘মেহেদী’। কারণ, নামের ভেতর যে অর্থটা রয়েছে, সেটা এখনও পুরোনো হয়নি।