যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষার্থী ও এনভিডিয়ার সিনিয়র ডেটা সায়েন্টিস্ট ড. ইরফান আল-হুসাইনির মৃত্যুর ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ অভ্যন্তরীণ ফরেনসিক অটোপ্সি এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তার পরিবার, সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
শনিবার (২২ আগস্ট) বুয়েট প্রাঙ্গণে আয়োজিত ‘জাস্টিস ফর ইরফান আল-হুসাইনি’ কর্মসূচি থেকে এ দাবি জানানো হয়। কর্মসূচিতে ইরফানের মৃত্যুর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও মৃত্যুর আগে-পরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে কয়েকটি প্রশ্ন ও উদ্বেগের কথা জানানো হয়।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ জুলাই ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজ বাসা থেকে অচেতন অবস্থায় ইরফানকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর আগে তিনি বাসা থেকেই কর্মস্থলের সহকর্মীদের সঙ্গে অনলাইন প্রেজেন্টেশনে অংশ নেন। তার সহকর্মীরা নিশ্চিত করেছেন, ওই দিন সকাল প্রায় ৯টা পর্যন্ত তিনি অনলাইন প্রেজেন্টেশন করেছিলেন।
এরপর সকাল ১০টা ২ মিনিটে ইরফানের মোবাইল ফোন থেকে তার কর্মস্থলে একটি বার্তা পাঠানো হয়। সেখানে স্ত্রীর অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে দিনের বাকি সময়ের জন্য ছুটি চাওয়া হয়।
এর মাত্র ২০ মিনিট পর, সকাল ১০টা ২২ মিনিটে পালো অল্টো পুলিশের কল রেকর্ড অনুযায়ী, ইরফানের বাসা থেকে ৯১১-এ ফোন করে আত্মহত্যার ঘটনা জানানো হয়। ওই সময় ইরফানের স্ত্রী ড. ফাবিয়া ফারলিন অ্যাথেনা বাসায় ছিলেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আয়োজকদের দাবি, সকাল ৯টার দিকে প্রেজেন্টেশন শেষ হওয়ার পর সকাল ১০টা ২ মিনিটে কর্মস্থলে বার্তা পাঠানো এবং ১০টা ২২ মিনিটে ৯১১-এ ফোন করার মধ্যবর্তী সময়ের বিস্তারিত ঘটনা এখনো পরিষ্কার নয়। জরুরি সেবা দলের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরফানের মস্তিষ্কে অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট অক্সিজেন সরবরাহ ছিল না। এতে তার মস্তিষ্কে অপরিবর্তনীয় ক্ষতি হয় বলে জানানো হয়েছে।
পরে স্ট্যানফোর্ড মেডিকেল সেন্টারের আইসিইউতে নয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৩০ জুলাই ইরফান আল-হুসাইনি মারা যান।
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মৃত্যুর পর ইরফানের মরদেহ প্রথমে করোনারের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে কেবল বাহ্যিক পরীক্ষা করা হয় এবং পরে মরদেহ তার স্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে তার মরদেহের কোনো পূর্ণাঙ্গ অভ্যন্তরীণ ফরেনসিক অটোপ্সি করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
মৃত্যুর পর দাফনের উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইরফানের পরিবার, বন্ধু ও সহপাঠীরা। তাদের দাবি, ইরফানের মরদেহ স্ত্রীর কাছে হস্তান্তরের পর তার নিকটতম পরিবার ও বন্ধুদের অবহিত না করেই দাফনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১ আগস্ট ইরফানের স্ত্রী তার এনভিডিয়ার এক সহকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করে দাফনের জন্য উপযুক্ত স্থান খুঁজে দিতে সহযোগিতা চান। অথচ ওই সময় পর্যন্ত ইরফানের পরিবার ও বন্ধুরা দাফনের কোনো আয়োজনের বিষয়ে অবগত ছিলেন না বলে দাবি করা হয়।
পরে ৪ আগস্ট ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৩৮ মিনিটে ‘সানডে মর্নিং সকার (গারফিল্ড)’ নামের একটি ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপে জানানো হয়, ৭ আগস্ট স্থানীয় একটি মসজিদে ইরফানের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। তবে ওই সময়ের মধ্যে ইরফানের বন্ধুদের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মৃত্যু নিয়ে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশের পর জানাজার পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়।
পরদিন ৫ আগস্ট রাত ৯টা ৮ মিনিটে একই ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপে জানাজা স্থগিতের বিষয়টি জানানো হয়।
ইরফানের স্বজন ও সহপাঠীদের দাবি, মৃত্যুর তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো তাদের কাছে পরিষ্কার নয়। তদন্ত চলমান থাকলেও ঘটনাটিকে যে মাত্রার গুরুত্ব ও জরুরিতার সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন, সে অনুযায়ী যথাযথ মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না বলে তারা মনে করছেন।
আয়োজকেরা বলেন, ইরফানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ অভ্যন্তরীণ ফরেনসিক অটোপ্সি জরুরি। তাদের দাবি, দ্রুত অটোপ্সি সম্পন্ন করা গেলে তার জানাজা ও দাফনও যথাযথভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
ইরফানের পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অটোপ্সির জন্য তার স্ত্রীর সম্মতি প্রয়োজন হলেও বারবার অনুরোধের পরও এখন পর্যন্ত সেই সম্মতি পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে পরিবার। তাদের মতে, আদালতের আদেশ বা পুলিশের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অটোপ্সির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা তুলনামূলকভাবে সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
এ অবস্থায় ইরফানের পরিবারের পক্ষ থেকে তিনটি প্রধান দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হলো—ইরফানের পিতা-মাতার অনুরোধ অনুযায়ী যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ায় দ্রুত তার মরদেহের পূর্ণাঙ্গ অভ্যন্তরীণ ফরেনসিক অটোপ্সি করা; তার মরদেহের হেফাজত দ্রুত পিতা-মাতার কাছে হস্তান্তর করা; এবং ডিজিটাল ফরেনসিকসহ একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা।
আয়োজকদের বক্তব্য, তদন্তে যদি ইরফানের আত্মহত্যার বিষয়টি প্রমাণিত হয়, তাহলে কী পরিস্থিতিতে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
তারা আরও বলেন, মৃত্যুর ২১ দিন পরও ইরফানের মরদেহ হিমাগারে রয়েছে। মরদেহ থেকে কোনো শারীরিক আলামত নষ্ট বা হারিয়ে যাওয়ার আগেই পূর্ণাঙ্গ অভ্যন্তরীণ ফরেনসিক অটোপ্সি সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ইরফানের স্ত্রী ড. ফাবিয়া ফারলিন অ্যাথেনা এবং সান্তা ক্লারা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের প্রতি ইরফানের পরিবারের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন তার স্বজন, সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
বুয়েটের ইইই বিভাগের ২০১২ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন ইরফান আল-হুসাইনি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া টেক ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। মৃত্যুর আগে তিনি বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ায় সিনিয়র ডেটা সায়েন্টিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার বাবা ড. তাহমিদ মালিক আল-হুসাইনি বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক।