সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কখন কোন বিষয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে, তা আগেভাগে বলা কঠিন। কখনও একটি ছবি, কখনও একটি বাক্য, আবার কখনও মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। সম্প্রতি এমনই একটি ভিডিও ঘিরে তৈরি হয়েছে সমালোচনা, পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং শেষ পর্যন্ত এক অভিনব সংহতির গল্প।
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল। গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি। ভিডিওটিতে তাকে হালকা বাতাসে শাড়ির আঁচল উড়িয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে দেখা যায়। পেছনে বাজছিল জনপ্রিয় গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’।
ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় নানামুখী প্রতিক্রিয়া। শিক্ষিকার এমন ভিডিও প্রকাশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। সমালোচনা, ট্রল ও কটূক্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে।
তবে এই সমালোচনার জবাব এসেছে ভিন্ন এক উপায়ে।
দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষক-শিক্ষিকারা একই গান ব্যবহার করে নিজেদের ভিডিও প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। অনেকেই শাড়ির আঁচল উড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করছেন ভিডিও। ভিডিওগুলোর মূল বার্তা একটাই—সহকর্মীর প্রতি সংহতি।
শুধু ভিডিও নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নানা ধরনের বার্তাও। এক শিক্ষিকা সোনিয়া আক্তার নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারণ করা একটি পুরোনো ভিডিও শেয়ার করে লেখেন, ভিডিওটি প্রায় দুই বছর আগের। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার দিন তার এক শিক্ষার্থীই ভিডিওটি ধারণ করেছিল। তার ভাষ্য, এমন ভিডিও করার কারণে কখনও তাকে হেনস্তার মুখে পড়তে হয়নি, বরং কলেজের অধ্যক্ষ, সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েছেন। একই পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এমন একটি সাধারণ বিষয়কে ঘিরে কেন বিতর্ক তৈরি হলো।
মাদারীপুরের সহকারী শিক্ষিকা সামিয়া শিকদারও নিজের ভিডিও প্রকাশ করে লেখেন, ‘বিউটি রানী পাল ম্যাডামকে হেনস্তার চেষ্টা সফল হয়নি। আজ প্রতিটি সাহসী শিক্ষকই একেকজন বিউটি রানী পাল। আমরা মাথা নত করব না, সম্মান নিয়ে এগিয়ে যাব।’
এমন পোস্ট এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা একই গান ব্যবহার করে ভিডিও প্রকাশ করেছেন। অনেকের মতে, এটি কেবল একটি ভিডিওর সমর্থন নয়, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা এবং পারস্পরিক সহমর্মিতার পক্ষে অবস্থান।
সংহতি জানিয়ে অনেকে লিখছেন, শিক্ষকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা হলেও একজন শিক্ষকও মানুষ। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ, শিল্প-সংস্কৃতি চর্চা কিংবা নিজের মতো করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিত থাকার অধিকারও তার রয়েছে। তাদের মতে, এই ব্যক্তিগত প্রকাশকে নেতিবাচকভাবে দেখার পরিবর্তে সম্মান জানানো উচিত।
উল্লেখ্য, বিউটি রাণী পাল এর আগে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।