মাত্র তিন সপ্তাহ। বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার হওয়ার পর ইলন মাস্কের সেই রেকর্ড ভেঙে নিচে নেমে আসতে ঠিক এতটুকুই সময় লেগেছে।
গত ১২ জুন যখন নাসদাক শেয়ার বাজারে স্পেসএক্সের ব্লকবাস্টার অভিষেক হয়, তখন বিনিয়োগকারীদের মাঝে এই শেয়ার কেনার ধুম পড়ে গিয়েছিল।
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেয়ারের প্রারম্ভিক মূল্য ১৩৫ ডলার নির্ধারণ করা হলেও লেনদেন শুরুই হয় ১৫০ ডলারে এবং পরবর্তী অধিবেশনগুলোতে এর দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।
একপর্যায়ে কোম্পানির বাজার মূলধন প্রায় ২ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়, যা সাময়িকভাবে অ্যামাজনকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
এর ফলে মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং তৈরি হয় নতুন এক ইতিহাস। এমনকি ভারতের খুচরা বিনিয়োগকারীরাও টোকেনাইজেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই শেয়ার কেনেন।
তবে এই উন্মাদনা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। জুলাইয়ের শুরুর দিকে স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ চূড়া থেকে ৩০ শতাংশেরও বেশি পড়ে যায়। এতে কোম্পানিটির বাজারমূল্য থেকে কয়েক শ বিলিয়ন ডলার উধাও হয়ে যায়।
সম্পদ ট্র্যাকারগুলোর হিসাব অনুযায়ী, মাস্কের মোট সম্পদ আবারও ট্রিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসে বর্তমানে ৯৯২ থেকে ৯৯৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে।
মাস্ক এখনও বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন, তবে ট্রিলিয়নেয়ার খেতাবটি আর তার নামের পাশে নেই।
স্পেসএক্স আইপিও: তাহলে কী পরিবর্তন এলো
স্পেসএক্সের ব্যবসায়িক মডেলে কোনো গলদ ছিল না। শেয়ার বাজারের গ্রাফ দেখে যেমনটা মনে হচ্ছে, কোম্পানির মূল ভিত্তি কিন্তু হঠাৎ করে খারাপ হয়ে যায়নি। তাদের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিঙ্ক দ্রুত গতিতে গ্রাহক সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে।
পাশাপাশি এআই কোডিং স্টার্টআপ কারসরকে ৬০ বিলিয়ন ডলারের অল-স্টক চুক্তিতে অধিগ্রহণের ঘোষণার পর স্পেসএক্স এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতেও আগ্রাসীভাবে পা বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রকেট উৎক্ষেপণ সেবা, স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এবং এআই অবকাঠামো, সব খাতেই কোম্পানিটির দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দারুণ।
ভেস্টেড ফাইন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিরাম শাহ বলেন, এই দরপতনের মানে এই নয় যে, স্পেসএক্স হঠাৎ করে কোনো দুর্বল কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে।
বিরামের মতে, বিনিয়োগকারীরা এখানে মূলত বাস্তবতার চেয়ে অতি প্রত্যাশার একটি চিরাচরিত প্রতিফলন দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘কোম্পানিগুলো যখন অত্যন্ত চড়া মূল্যায়নে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হয়, তখন শক্তিশালী ব্যবসার ক্ষেত্রেও এমন বড় ধরনের দরপতন দেখা দিতে পারে।
‘বিনিয়োগকারীরা প্রায়শই একটি ভালো কোম্পানি এবং একটি ভালো শেয়ারের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন। এই দুটি জিনিস সবসময় এক নয়।’
আইপিওটি যেমন ছিল বিশাল, তেমনি সংকীর্ণ
শুনতে কিছুটা অবিশ্বাস্য ও পরস্পরবিরোধী মনে হলেও, শেয়ার বাজারের এই অস্থিরতার মূল কারণ এটাই।
স্পেসএক্স ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও নিয়ে এসে প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহ করে, যা লিস্টিং-এর দিনে কোম্পানির মূল্য দাঁড় করায় প্রায় ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে। বিনিয়োগকারীদের চাহিদাও ছিল আকাশচুম্বী।
আইপিওতে শেয়ারের চাহিদার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আবেদন জমা পড়েছিল। তবে মূল সমস্যা ছিল, কোম্পানির মোট শেয়ারের চেয়ে খুবই সামান্য অংশ সাধারণ লেনদেনের জন্য বাজারে ছাড়া হয়েছিল।
বাজারে শেয়ারের এই স্বল্পতার কারণে প্রতিদিন হাতবদল হওয়ার মতো পর্যাপ্ত শেয়ার ছিল না। ফলে সাধারণ কেনাবেচার সামান্য চাপেই শেয়ারের দামে বড় ধরনের ওঠানামা তৈরি হয়।
বিরাম শাহ বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারের এই অভ্যন্তরীণ কাঠামোটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
‘যখন বাজারে মুক্তভাবে লেনদেন হওয়া শেয়ারের সংখ্যা সীমিত থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই অস্থিরতা অনেক বেড়ে যায়। এটি দিয়ে কোম্পানির ব্যবসায়িক যোগ্যতার কোনো পরিবর্তন বিচার করা ঠিক হবে না।’