রাজধানীর রাজপথে এখন বারুদের গন্ধ আর রক্তের আলপনা। দীর্ঘদিনের স্তব্ধতা ভেঙে ঢাকার অপরাধজগতে বইছে এক প্রলয়ংকরী ঝড়। সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই পুরনো বিভীষিকা। গত বছরের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর একে একে কারামুক্ত হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দাপটে ওষ্ঠাগত জনজীবন।
গত মঙ্গলবার রাতে নিউমার্কেটের বুকে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের নিথর দেহ লুটিয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে এই অস্থিরতা এখন এক চরম মরণখেলায় রূপ নিয়েছে। পুলিশের ধারণা, এলাকা দখল, চাঁদাবাজি এবং গডফাদারদের ইশারায় ঢাকার বিভিন্ন জোনে এখন ‘রক্তের হোলিখেলা’ চলছে। অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রকরা তাদের হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের খবর অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কারাগারের লৌহকপাট পেরিয়ে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেন একঝাঁক কুখ্যাত অপরাধী। কিলার আব্বাস, সুইডেন আসলাম, পিচ্চি হেলাল থেকে শুরু করে সানজিদুল ইসলাম ইমন ও খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন—জামিনে মুক্ত হয়েই তারা মেতে ওঠেন পুরনো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের নেশায়। নিজ নিজ এলাকায় অনুসারীদের সংগঠিত করে তারা যেন জানান দিচ্ছিলেন এক আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস। সেই ঝড়ের বলি হলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন।
গত মঙ্গলবার রাতের অন্ধকারে নিউমার্কেট এলাকায় যখন বুলেটের শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো, তখন নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়ল এক সময়ের দাপুটে এই নাম। অভিযোগের আঙুল উঠেছে তার আপন দুলাভাই সানজিদুল ইসলাম ইমনের দিকে। রক্তের সম্পর্কের চেয়েও যখন মাটির আধিপত্য বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখনই হয়তো এমন ট্র্যাজেডির জন্ম হয়। হাজারীবাগ, ধানমন্ডি আর মোহাম্মদপুরের অলিগলি কার দখলে থাকবে—এই এক প্রশ্নেই শ্যালক ও দুলাভাইয়ের মধ্যে তৈরি হয়েছিল দুর্ভেদ্য প্রাচীর। মালয়েশিয়ার দূর পরবাসে বসেই ইমন এই খুনের ‘নীল নকশা’ সাজিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই অদৃশ্য রিমোট কন্ট্রোলে আজ আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নভিন্ন, আর রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে আপনজনেরই রক্তে।
রাজধানীর পিচঢালা রাজপথ আজ যেন এক রক্তাক্ত মানচিত্র। শান্তির নীড় এই ঢাকা এখন লাশের মিছিলে ভারাক্রান্ত। পরিসংখ্যানের শুষ্ক অক্ষরের আড়ালে লুকিয়ে আছে স্বজন হারানো শত শত দীর্ঘশ্বাস। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই রাজধানীর আকাশ প্রকম্পিত হয়েছে ১০৭টি হত্যাকাণ্ডের করুণ আর্তনাদে। চলতি বছরের মার্চে বয়ে গেছে বারুদের গন্ধ। ক্যালেন্ডারের পাতায় কেবল মার্চ মাসেই ঠাঁই পেয়েছে ৩৩টি খুনের ঘটনা। আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য আর ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার অনলে পুড়েছে একেকটি তাজা প্রাণ। প্রতিটি ভোর যেন এক নতুন লাশের সংবাদ নিয়ে হাজির হচ্ছে এই তপ্ত মেগাসিটিতে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আন্ডারওয়ার্ল্ডের কোনো বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না। অপরাধী সে যেই হোক, আইনের আওতায় আনা হবে।
রাজধানীর মিরপুর থেকে পল্লবী—একসময়ের ব্যস্ত এই জনপদে এখন খেলা করছে এক অদৃশ্য আতঙ্কের ছায়া। যে আকাশে শান্তির পায়রা ওড়ার কথা ছিল, সেখানে এখন ডানা মেলেছে ‘ফোর স্টার গ্রুপ’ নামক এক নতুন বিভীষিকা। মিরপুর-১০ থেকে পল্লবীর অলিগলি আজ এই বাহিনীর মরণকামড়ে ক্ষতবিক্ষত, যেখানে বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত তটস্থ থাকেন এক অজানা আশঙ্কায়। সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে বসে একে পরিচালনা করছেন পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন, ইব্রাহিম, শাহাদাত ও মুক্তার। তাদের ইশারায় ঢাকার রাজপথে এখন লাশের মিছিল।
গোয়েন্দা পরিসংখ্যান বলছে, গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর শুধু মিরপুর জোনেই ঝরেছে অন্তত ৫৭টি তাজা প্রাণ, যার মধ্যে কেবল পল্লবী এলাকাতেই ১৫ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। প্রতিটি বুলেট আর প্রতিটি রক্তবিন্দু যেন এই গ্রুপের পৈশাচিক আধিপত্যেরই স্বাক্ষর বহন করছে।
অস্ত্রের ঝনঝনানির পাশাপাশি চলছে নীরব লুণ্ঠন। কিলার আব্বাস ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে উঠেছে ঠিকাদারদের জিম্মি করার অভিযোগ। উন্নয়নের চাকাকে থামিয়ে দিয়ে তারা ঠিকাদারদের বাধ্য করছে নির্দিষ্ট দামে নির্মাণসামগ্রী কিনতে আর গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের চাঁদা। যারা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, তাদের কপালে জুটছে মৃত্যুর পরোয়ানা। মিরপুরের এই অশান্ত জনপদ কি তবে চিরকালই অন্ধকারের হাতে জিম্মি থাকবে? নাকি আইনের কঠোর শাসনে ফিরবে শান্তির সুবাতাস? সেই উত্তরের প্রতীক্ষায় দিন গুনছে তটস্থ মিরপুরবাসী।
দেশের মানচিত্র ছাড়িয়ে পরদেশের বিলাসী প্রাসাদে তারা নিরাপদ। কিন্তু সেখান থেকেই তাদের অদৃশ্য আঙুলের ইশারায় প্রকম্পিত হচ্ছে ঢাকার রাজপথ। রাজধানীর অপরাধজগৎ আজ এক অদ্ভুত ‘রিমোট কন্ট্রোল’ শাসনের অধীনে, যেখানে ঘাতকের বুলেটে বারুদ ভরে দেওয়া হয় সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপার থেকে।
ঢাকার আভিজাত্যের কেন্দ্রবিন্দু গুলশান আর ব্যস্ত বাড্ডার নিয়ন্ত্রণ আজ শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদের মুঠোয়; যার নিঃশ্বাস এই শহরে না থাকলেও ত্রাস ছড়িয়ে আছে প্রতিটি অলিগলিতে। উত্তরের বন্দরনগরী চট্টগ্রামে রাজত্ব করছেন ‘বড় সাজ্জাদ’, যার মারণ-নির্দেশ আসে বিদেশের মাটি থেকে। অন্যদিকে, শ্যালক টিটন খুনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে অভিযুক্ত ইমন মালয়েশিয়ার দূর প্রবাস থেকেই পরিচালনা করছেন তার নিজস্ব বাহিনী।
শুধু বিদেশের মাটি নয়, অন্ধকূপের লৌহকপাটও দমাতে পারেনি আন্ডারওয়ার্ল্ডের রক্তলিপ্সা। কারাগারে বন্দি থেকেও সুব্রত বাইন আর মোল্লা মাসুদের ইশারায় সক্রিয় তাদের বিশ্বস্ত অনুসারীরা। মগবাজারের শান্ত জনপদ আজ তাদেরই মাদক ব্যবসা আর চাঁদাবাজির নীল দংশনে নীলকণ্ঠ। কারাগারের অন্ধকার থেকে আসা একেকটি বার্তা রাজধানীর রাজপথে নতুন কোনো লাশের মিছিলে রূপ নেয়। অদৃশ্য এই সাম্রাজ্যের অধিপতিরা দূরে থাকলেও তাদের ছায়া আজ প্রতিটি মানুষের পিছু ধাওয়া করছে। এই রক্তক্ষয়ী খেলার অবসান কোথায়, সেই উত্তর হয়তো এখন কেবল সময়ের হাতেই জমা আছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সব ইউনিটকে বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে। ইন্টারপোলের মাধ্যমে বিদেশে আত্মগোপনকারী সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রাজধানীর প্রতিটি মোড়ে আজ যে হাহাকার, তার মূলে রয়েছে হাতের নাগালে থাকা মরণাস্ত্র আর কারামুক্ত অপরাধীদের বেপরোয়া বিচরণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই তপ্ত নগরীকে শান্ত করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি থামানো। যে আগ্নেয়াস্ত্র আজ রাজপথে রক্তের আল্পনা আঁকছে, সেই বিষদাঁত উপড়ে ফেলাই এখন সময়ের দাবি। কারাগারের অন্ধকার থেকে যারা আলোর মুখ দেখেছেন, তাদের প্রতিটি কদম যদি কঠোর নজরদারির আওতায় না থাকে, তবে এই সামাজিক অস্থিরতা এক ভয়াবহ দাবানলে রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, কেবল ঘোষণা বা হুঁশিয়ারি নয়, বরং মাঠপর্যায়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে না পারলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই মরণকামড় থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
নগরীর প্রতিটি মানুষ এখন সেই ভোরের অপেক্ষায়, যেখানে বুলেটের শব্দে নয়, বরং শান্তির সুবাতাসে ভাঙবে তাদের ঘুম। সেই শান্তি ফিরিয়ে আনতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার আর অপরাধীদের ওপর অতন্দ্র প্রহরীর মতো নজরদারির কোনো বিকল্প নেই।