শ্যালক-দুলাভাই বিরোধের রক্তাক্ত অবসান
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে একসময়ের ‘মানিক-জোড়’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তারা। একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন, অন্যজন তার আপন শ্যালক ও প্রধান সেনাপতি খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। কিন্তু সেই আত্মীয়তার বন্ধন আর অপরাধ জগতের আনুগত্য শেষ পর্যন্ত টিকে থাকল না। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে নিউমার্কেট এলাকায় টিটন হত্যাকাণ্ডের পর গোয়েন্দা ও অপরাধ জগতের সূত্রগুলো বলছে, শ্যালক-দুলাভাইয়ের দীর্ঘদিনের বিরোধ আর আধিপত্যের লড়াইয়ের বলি হয়েছেন টিটন।
সেনাপতি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী নব্বইয়ের দশকে ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর ও রায়েরবাজার এলাকায় ইমনের অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার নেপথ্যে মূল কারিগর ছিলেন টিটন। ইমনের হয়ে মাঠ পর্যায়ের সব অপারেশন পরিচালনা করতেন তিনি। তবে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার ফলে এই সম্পর্কে ফাটল ধরে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকা অবস্থায় আর্থিক ভাগবাটোয়ারা এবং একক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুজনের মধ্যে চরম তিক্ততা তৈরি হয়। ইমন একসময় বুঝতে পারেন, টিটন তার অনুগত সেনাপতি থেকে এখন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছেন।
গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান টিটন। মুক্ত হওয়ার পর তিনি তার আদি এলাকা রায়েরবাজারের সুলতানগঞ্জে নিজের আধিপত্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। কিন্তু বিদেশে পলাতক ইমন নিজের অনুসারীদের মাধ্যমে টিটনকে এলাকায় ঢুকতে কড়া নিষেধাজ্ঞা দেন। অভিযোগ রয়েছে, ইমনের ক্যাডাররা বেশ কয়েকবার টিটনকে প্রাণনাশের হুমকিও দিয়েছিল। নিজ এলাকায় ফিরতে না পেরে টিটন অনেকটা ‘ভবঘুরে’ জীবনযাপন করছিলেন, যা তাকে ঘাতকদের জন্য সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইমনের হাত থাকার প্রবল সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও সাবেক সেনাপ্রধানের ভাই টিপু হত্যার প্রতিশোধের তত্ত্বটি আলোচনায় আছে, তবে টিটনের বর্তমান মুভমেন্ট ও ইমনের সঙ্গে তার সাম্প্রতিক বিরোধকে সবচেয়ে বড় ক্লু হিসেবে দেখছে তদন্তকারীরা। গোয়েন্দাদের ধারণা, টিটন পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে ইমনের সাম্রাজ্যে ভাগ বসাতে পারেন—এমন ভয় থেকেই তাকে পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, টিটন হত্যাকান্ডে সব বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে। অতীত এবং বর্তমান শত্রুতার তালিকা করছি। শ্যালক-দুলাভাইয়ের বিরোধের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। ইমনের বর্তমান অবস্থান এবং তার অনুসারীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ভুলে অপরাধ জগতের এই আপনজনদের লড়াই ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডকে আবারও অস্থির করে তুলতে পারে।