গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবনের প্ল্যানারি হলে স্থাপিত সাউন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (এসআইএস) পরিচালনা, মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ ভবনের এসআইএস সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণের নামে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাহিদুর রহিম জোয়ারদারসহ সংশ্লিষ্টরা। এছাড়াও মেডিকেল ইকুইপমেন্ট ক্রয়ের মাধ্যমেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে জাহিদুর রহিম জোয়ারদারের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) অনুসন্ধানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম। তিনি জানান, গত কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাসকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নথিপত্র চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। রেকর্ডপত্র হাতে পাওয়ার পর বিধি মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদক জানায়, জাহিদুর রহিম জোয়ারদার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের প্ল্যানারি হলে স্থাপিত ‘এসআইএস সিস্টেম’ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। অভিযোগ রয়েছে, এই উন্নয়ন কাজের আড়ালে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ বা কেনাকাটায় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম দেখিয়ে বিপুল সরকারি অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন তিনি।
আরও জানানো হয়, গত ৩০ আগস্ট ২০২৪-এর পর জাতীয় সংসদ ভবনের প্ল্যানারি হলে স্থাপিত এসআইএস সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং এটি চালু করা জরুরি হওয়ায় আগেই গণপূর্ত অধিদপ্তর উদ্যোগ নেয়। এর প্রেক্ষিতে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের নিকটাত্মীয় কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রহিম জোয়ারদারের প্রতিষ্ঠান তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মেরামত ও চালু করা সম্ভব মর্মে মতামত দেয় এবং প্রাক্কলন দাখিল করে। পরবর্তীকালে কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড নামক ওই প্রতিষ্ঠানটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য প্রকৌশলী আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়া ও সম্মানি ভাতা বাবদ ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা খরচের জন্য গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর আবেদন করে। এছাড়া পুরো সিস্টেমটির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য প্রায় চার কোটি টাকার একটি উচ্চমূল্যের প্রাক্কলন তৈরি করার অভিযোগও খতিয়ে দেখছে দুদক।
অভিযোগে বলা হয়, কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড অর্থ আত্মসাতের পাঁয়তারা অব্যাহত রাখে। গণপূর্তের বেশকিছু প্রকৌশলী এবং কর্মকর্তা এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। জাহিদুর রহিম সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর (লিটন চৌধুরী) ঘনিষ্ঠ বলেও জানা গেছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছে যেসব নথিপত্র তলব করেছে দুদক:
অনুসন্ধান কর্মকর্তা গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছে প্রধানত চার ধরনের রেকর্ডপত্র চেয়ে চিঠি দিয়েছেন। তলব করা গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের মধ্যে রয়েছে—
১. কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের মাধ্যমে সংসদ ভবনের এসআইএস সিস্টেম পরিচালনা, মেরামত ও সংস্কারের কার্যাদেশ এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ার যাবতীয় রেকর্ডপত্র।
২. মালামাল ক্রয়ের চাহিদাপত্র, প্রশাসনিক অনুমোদন, বাজার যাচাই প্রতিবেদন, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির রেজুলেশন, মালামাল সরবরাহের কার্যাদেশ এবং গুণগত মান যাচাইয়ের সার্টিফিকেট।
৩. বিল পরিশোধের ভাউচার, স্টক রেজিস্ট্রার, নোটশিট এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট নথির সত্যায়িত ফটোকপি।
৪. ৫ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের এসআইএস সিস্টেমসহ দাপ্তরিক অফিসের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন ও নথির তালিকা।
৫. এসআইএস সিস্টেম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের নাম, পদবি ও বর্তমান ঠিকানাসহ পূর্ণাঙ্গ তথ্য।
৬. ৫ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের এসআইএস সিস্টেমসহ দাপ্তরিক অফিস কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হয়ে থাকলে কী পরিমাণ নথি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে সংক্রান্ত তালিকা, গঠিত কমিটির প্রতিবেদন।
এছাড়া সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল কি না, সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে দুদক।