মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার চরাঞ্চলে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থক জসিম উদ্দিনকে (২৮) কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টা পর্যন্ত এ ঘটনায় থানায় মামলা ও অভিযোগও হয়নি। নিহতের ঘটনায় সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের চর আবদুল্লাহ্ গ্রামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।
এর আগে শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে উপজেলার আধারা ইউনিয়নের চর আবদুল্লাহ গ্রামে জসিম উদ্দিন নামের ওই যুবককে তার বাড়ির পাশে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করে ধানের শীষ প্রতীকের সমর্থক নাসির দেওয়ান ও তার ছেলে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম-আহবায়ক শাকিল দেওয়ান গংরা। পরে ওই দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান জসিম।
এ ঘটনায় নিহত জসিম উদ্দিনের বাবা মাফিক নায়েব, ভাই মোখলেস নায়েব গুরুত্বর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মুন্সীগঞ্জ থানার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ফিরোজ কবির শনিবার বেলা ১১ টার দিকে জানান, জসিম উদ্দিন নায়েব হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা হয়নি। অভিযুক্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। তবে পুলিশের কয়েকটি দল গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ঘটনাটি পূর্ব বিরোধের জের ধরে হয়েছে। তবে নির্বাচনকে কাজে লাগানো হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, নিহত জসিম উদ্দিন নায়েব চর আবদুল্লাহ গ্রামের মাফিক নায়েবের ছেলে। তিনি ও তার স্ত্রী হাবিবা মিলে নিজ বাড়ি সংলগ্ন একটি নারী ও একটি পুরুষ মাদরাসা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। তবে এবার সংসদ নির্বাচনে জসিম ও তার পরিবারের সদস্যরা মুন্সীগঞ্জ-৩ (সদর-গজারিয়া) আসনের ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী জেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সদস্য সচিব ও পরাজিত মো. মহিউদ্দিনের সমর্থক ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত জসিম উদ্দিন ও তার পরিবারের লোকজন ফুটবল প্রতীকের সমর্থক ছিলেন। ওই গ্রামের ধানের শীষের সমর্থক ছিলেন নাসির দেওয়ান ও তার ছেলে শাকিল দেওয়ান গংরা।
শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে জসিম উদ্দিন বাড়ির পাশের জমিতে গরুর জন্য ঘাস কাটছিলেন। তার বাবা মাফিক নায়েব, ভাই মোখলেস নায়েব ও মহসিন নায়েব বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। এ সময় নাসির, শাকিল, নুরে আলম সাগর, শওকত আলী সরকার, জাহাঙ্গীর সরকারসহ দেড়-দুইশো জনের একটি দল তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। বাড়ির ভেতরে জসিমের দুইভাই ও বাবাকে পিটিয়ে আহত করা হয়।
জমিতে গিয়ে হামলাকারীরা জসিমকে কোপায়, লাঠি-সোটা দিয়ে পেটায়। পরে গুরুতর অবস্থায় দুই ভাই জসিম ও মোখলেস এবং বাবা মাফিক নায়েবকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ দিন সন্ধ্যায়ই জসিম মারা যান।
স্থানীয় ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর শুক্রবার সকাল থেকেই শাকিল ও তার বাবা নাসির দেওয়ানরা তাদের দলবল নিয়ে চর আব্দুল্লাহ গ্রামে মহড়া দিতে থাকেন। যারা ফুটবলের সমর্থক ছিলেন, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন। কয়েকজন বয়স্ক মানুষকেও তারা চড় থাপ্পড় মারেন। কেউ ভয়ে লজ্জায় মুখ খোলেনি।
বিকেল ৩টার দিকে জসীম উদ্দিনদের বাড়িতে দুইশোর অধিক মানুষ নিয়ে যায় হামলাকারীরা। বাড়িটিকে চারদিক থেকে তারা ঘিরে ফেলে। সেখানে ওই পরিবারটিকে বেধড়ক মারধর করা হয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মূলত শাকিল-জসিম উদ্দিনদের বিরোধ সৃষ্টি হয়। এর আগে তাদের মধ্যে কোন ধরনের বিরোধ ছিল না।
জসিমের মৃত্যুর ঘটনার পর থেকে বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। জসিম উদ্দিনের স্বজনরা বাড়িতে এসে আহাজারি করছেন। তার বাবা ও আরেক ভাইয়ের অবস্থা সংকটাপন্ন বলে দাবি করেছেন তার স্বজনরা।
মৃত জসিমের বড় ভাইয়ের স্ত্রী হাবিবা বেগম বলেন, আমাদের কারও সঙ্গে আগে কোনো বিরোধ ছিল না। আমার দেবর, শ্বশুর, ভাসুররা কেউই রাজনীতি করত না। শুধু এবার নির্বাচনে ফুটবলে ভোট দিয়েছিল। এটাই তাদের দোষ ছিল। এজন্য একজনকে মেরে ফেললো। শ্বশুর ও আরেক দেবরের অবস্থাও বেশি ভালো না। তারা চিকিৎসাধীন অবস্থায় বার বার বমি করছেন।
এদিকে, শনিবার বেলা ১২ টার দিকে শাকিলের হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতের অভিযোগে মুন্সীগঞ্জ সদর থানা সেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম-আহবায়ক পদ থেকে শাকিব দেওয়ানকে বহিষ্কার করেছেন।