বাগেরহাটের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচন পরবর্তী হামলা-পাল্টাহামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষে অন্তত ৩৫ জন আহত হয়েছেন। ভোট গণনা শেষে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাত থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাল্টাপাল্টি হামলায় তারা আহত হয়েছেন। হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগে ইতোমধ্যে দুজনকে আটক করেছে পুলিশ।
হামলা-পাল্টাহামলায় বাগেরহাট সদর, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলায় অন্তত ২০টি বসতবাড়ি ভাঙচুর ও তছনছ করেছে প্রতিপক্ষরা। এ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করা হচ্ছে।
পরাজিত-বিজয়ী প্রার্থীদের সমর্থকদের বাড়িঘর ভাঙচুর
বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের মান্দ্রা গ্রামে ওয়ার্ড জামায়াতের সেক্রেটারি কারি মোল্লা, জামায়াত কর্মী জাহাঙ্গীর শেখ, ইয়াকুব আলী হাওলাদার ও মশিউর রহমানসহ পাঁচ থেকে ছয়জনের বাড়িঘর ভাঙচুর হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গভীর রাতে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল লোক এ ঘটনা ঘটায়।
এ ঘটনার জেরে শুক্রবার সকালে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিরাজুল ইসলামের বাড়িসহ বিএনপি সাত থেকে আটজন কর্মীর বাড়িতে হামলা ও ভাংচুর হয়েছে। বিএনপির অভিযোগ, জামায়াতের সমর্থক আনোয়ারুল হাওলাদার ও সুমন হাওলাদারের নেতৃত্বে হামলা হয়েছে।
খবর পেয়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ ওই এলাকা থেকে ইমরান ও তারেক নামের দুজনকে আটক করেছে।
ভোট কম পাওয়ায় চাঁদা দাবি
অন্যদিকে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার চন্দ্রপাড়ায় এলাকায় বিএনপি প্রার্থী ভোট কম পাওয়ায় স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবি করে। পরে তা না পেয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। আহত অবস্থায় ব্যবসায়ী শেখ আব্দুস সালামকে উদ্ধার করে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার বাড়ি চন্দ্রপাড়ায় গ্রামে।
আব্দুস সালামের ছেলে নাহিদ হাসান অভ্র বলেন, ‘শুক্রবার সকালে স্থানীয় বাজার থেকে সার কিনে পায়ে হেটে বাড়ি ফেরার পথে ফতেপুর বাজারের কাছে একদল সন্ত্রাসী রামদা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে আমার বাবার পথ রোধ করে। স্থানীয় বিএনপির সমর্থক শামীম শেখ, আমিন শেখসহ ওই সন্ত্রাসীরা আমার বাবার কাছে প্রশ্ন করে, ধানের শীষ কেন্দ্রে ভোট কম পেল কেন, তোরা কি করছিস। বাবা তাদের বলে, আমি এখানের ভোটার না। তখন তারা দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। এক পর্যায়ে তারা লাঠিসোঁটা দিয়ে আমার বাবাকে বেধরক মারধর করে ফেলে যায়।’
এ ছাড়া কচুয়া উপজেলার গোপালপুর শহীদ আসাদ স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটের ফলাফল ঘোষনার পরে প্রতিপক্ষের মারধরে আসাদ মোল্লা, মোশারেফ শেখ ও শফিক মীর নামের বিএনপির তিন কর্মী আহত হয়েছেন।
আহতদের অভিযোগ, স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ এইচ সেলিমের (ঘোড়া প্রতীক) সমর্থক মিজান শেখের নেতৃত্বে কয়েকজন আসাদ মোল্লা ও মোশারেফকে মারধর করে। শরীফ শিকদার ও সজীব শিকদার মারধর করে শফিক মীরকে।
আবার কচুয়ার বাধাল বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত সমর্থকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে মোরেলগঞ্জ-শরণখোলায় বিএনপির পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে জামায়াত নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মারধর ও হুমকির অভিযোগ করেছেন ওই আসনের বিজয়ী প্রার্থী মো. আব্দুল আলীম।
আব্দুল আলীম বলেন, ‘দুই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মারধর ও হুমকির ঘটনা ঘটছে। এতে তাদের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করার কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তালা দিয়ে দিচ্ছে।’ তিনি প্রশাসনকে দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানান। অন্যথায় বিপরীত কিছু ঘটে গেলে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন
নির্বাচনে জেলার চারটি সংসদীয় আসনের মাধ্যে বাগেরহাট ১, ২ ও ৪ আসনের জামায়াত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। আর বাগেরহাট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী জয় পেয়েছেন।
বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুর, হুমকি-ধামকির অভিযোগ তুলে বাগেরহাট জেলা জামায়াত আমির মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘নির্বাচন পরবর্তী সময়ে পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকরা জেলার বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা করছে। আমাদের নেতাকর্মীদের মারধার, বাড়িঘরে হামলা করেছে, হুমকি-ধামকি দিচ্ছে, যা মোটেই কাম্য নয়। আমরা আমাদের নেতাকর্মীদের সংযত থাকতে বলেছি। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’
তবে বাগেরহাট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এ টি এম আকরাম হোসেন তালিম বলেন, ‘আমরা সবাইকে শান্ত থাকতে বলেছি। নির্বাচন হয়ে গেছে, সবাই মেনে নিছে। এখন সংঘাতের কোনো কারণ নেই। এগুলোর সঙ্গে আমাদের দলের কেউ জড়িত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিটি ঘটনায় প্রশাসনকেও আমি কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাই।’
জানতে চাইলে বাগেহাটের পুলিশ সুপার মো. হাসান চৌধুরী বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ আসছে। ভাঙচুরসহ কিছু বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর আছে। যেকোনো অপরাদের বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স। যেসব ঘটনা ঘটেছে, জড়িতদের ধরতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।’